ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি তরুণ আন্দোলনের নেতাকে উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আটক করার ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে পরিচিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সমাবেশ শুরুর আগেই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং তাঁর সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে পুলিশ। একই দিনে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী দলের নেতা, শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও আন্দোলনকারীদেরও আটক করা হয়।
আটক হওয়ার আগে অভিজিৎ অভিযোগ করেন, তরুণদের আন্দোলন ঠেকাতে সরকার রাজধানীজুড়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তাঁর দাবি, ট্রেন চলাচলে বাধা, মেট্রো স্টেশনে নিয়ন্ত্রণ, সড়কে ব্যারিকেড এবং মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের মতো পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের চলাচল ও প্রতিবাদের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব ব্যবস্থার কারণ হিসেবে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
দিল্লির পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিরোধী শিবির ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে যে ভাষা ছড়িয়ে পড়েছে, তার একটি হলো—‘তেলাপোকা’ ঠেকাতে রাজধানীকে ‘লালকিল্লা’ বা দুর্গে পরিণত করা হয়েছে, আর পুরো ভারতকে বানানো হচ্ছে ‘কাশ্মীর’। এই তুলনার মাধ্যমে তাঁরা বোঝাতে চাইছেন, বিক্ষোভ দমনে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ও চলাচলে বিধিনিষেধের ফলে রাজধানী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে এটি আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক বক্তব্য; পরিস্থিতির নিরপেক্ষ মূল্যায়নে নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
উড়োজাহাজেই আটক আন্দোলনের নেতা
মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক করা হয় অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে। উড়োজাহাজের ভেতরে ধারণ করা ভিডিওতে তাঁদের আটকের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে অভিজিৎকে পুলিশের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, তাঁকে নিয়ে যেতে এবং গ্রেপ্তার করতে তিনি ভয় পান না। এ সময় উড়োজাহাজের ভেতরে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানও শোনা যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আটকের আগে অভিজিৎ অভিযোগ করেন, সরকার তরুণদের ভয় পাচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, জননিরাপত্তার কথা বলে কেন ট্রেন চলাচল ব্যাহত করা হচ্ছে, মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে এবং যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত করা হচ্ছে। তিনি ১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনাও করেন। তবে জরুরি অবস্থার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনাটি তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠিত কোনো আইনি সিদ্ধান্ত নয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে সমাবেশ ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা ও অন্যান্য সংগঠনের কর্মীদেরও বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়। আটকের সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা চূড়ান্ত হিসেবে উল্লেখ করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্ক
সিজেপির এবারের আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)। সংগঠনটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর একাংশের দাবি, সংশোধিত তালিকায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে এবং কিছু এলাকায় বিরোধী সমর্থকদের ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যাকে সরাসরি জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। মৃত, স্থানান্তরিত বা একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটারের নাম বাদ দেওয়াও তালিকা সংশোধনের স্বাভাবিক উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে। বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো—নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, সংশ্লিষ্ট ভোটারদের যথাযথ নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না এবং ভুলভাবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম পুনর্বহালের সুযোগ কতটা কার্যকর।
এই প্রশ্নকে সামনে রেখে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম না থাকা এবং সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের সমর্থকেরা আন্দোলনটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ এবং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার দাবি—দুটিই সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। স্বাধীন তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য ছাড়া এই অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
‘তেলাপোকা’ নামের আন্দোলনের উত্থান
ককরোচ জনতা পার্টির নামটি এসেছে ‘তেলাপোকা’ শব্দকে ঘিরে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা থেকে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে অভিজিৎ দীপকের একটি ভাইরাল পোস্ট থেকে এই আন্দোলনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। পরে এটি বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
গত জুলাইয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে আন্দোলনের পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনা সিজেপির সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। তবে কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের পেছনে একটি আন্দোলনই একমাত্র কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে ঘটনার পূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করতে হবে।
এবার সংগঠনটি নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ১০ অক্টোবরের কর্মসূচির আগে দিল্লি পুলিশ সমাবেশের অনুমতি দেয়নি বলে সংগঠনটি অভিযোগ করে। এরপরও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন অভিজিৎ ও তাঁর সহযোগীরা।
সরকার বলছে নিরাপত্তার কথা, বিরোধীদের অভিযোগ দমন-পীড়নের
দিল্লিতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন, ব্যারিকেড, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং আন্দোলনকারীদের আটকের ঘটনায় রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিরোধী নেতাদের একাংশের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সীমিত করে সরকার সমালোচনার কণ্ঠ রোধ করতে চাইছে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর দিল্লির নিরাপত্তাব্যবস্থাকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে, বিজেপির নেতারা আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারাও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন এবং আইনগত পথে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে আরোপিত বিধিনিষেধ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ছিল কি না এবং আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না। কোনো সমাবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, তার আইনি ভিত্তি এবং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন।
আন্দোলন থামবে, নাকি ছড়াবে
১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আটকের পরও সিজেপি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির নেতা আজিঙ্কে শিন্ডে জানিয়েছেন, অভিজিৎ দীপকে ও তাঁর সহযোগীরা আটক থাকা অবস্থায়ও কর্মসূচি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হবে। সংগঠনটির দাবি, দিল্লির বাইরে বিভিন্ন শহরেও ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির প্রশ্নে প্রতিবাদ হয়েছে।
তবে এই আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে এর সাংগঠনিক সক্ষমতা, বিরোধী দলগুলোর সমর্থন, জনসম্পৃক্ততা এবং ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের ওপর। শুধু কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা কিংবা আটকের সংখ্যা দিয়ে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগও স্বাধীন যাচাই ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা জরুরি।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ভারতে এই ঘটনা আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠলে নাগরিকদের প্রতিবাদ এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? আর রাষ্ট্র জননিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের সময় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত রাখবে?
দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্ব কেবল একটি সংগঠনের আন্দোলন বা কয়েকজন নেতার আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, বিরোধী মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার ব্যবহার—সব কটি প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশই এই বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।