কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে আজ রোববার (১১ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করুন এবং মেয়েদের অধিকারে বিনিয়োগ করুন’। বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূর করা এবং তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ নিশ্চিত করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বে প্রতি পাঁচজন মেয়ের একজনের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়। প্রতিবছর ১৮ বছরের কম বয়সী এক কোটিরও বেশি কন্যাশিশুর বিয়ে হয়। বাল্যবিয়ে শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়; এটি মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। দারিদ্র্য, বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতি, সংঘাত ও জলবায়ুজনিত সংকট অনেক ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশেও কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৫ বছর বয়সের আগেই। জরিপের তথ্য বলছে, গ্রামীণ এলাকায় বাল্যবিয়ের হার শহরের তুলনায় বেশি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও মেয়েদের শিক্ষার সুযোগের সঙ্গেও এ প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে।
বাল্যবিয়ে থামানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাল্যবিয়ের কারণে অনেক মেয়ের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়সে সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে গিয়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত হওয়া, পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে একটি বাল্যবিয়ে শুধু একজন কন্যাশিশুর বর্তমানকেই প্রভাবিত করে না, তার ভবিষ্যৎ জীবন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করতে পারে।
দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ এবং মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাল্যবিয়ের পেছনে কাজ করে। কোনো কোনো পরিবারে মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় হিসেবে বিয়েকে বিবেচনা করা হয়। আবার আর্থিক সংকটের কারণে পরিবারের দায়িত্ব কমানোর চিন্তাও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো, মেয়েদের শিক্ষায় ধরে রাখা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করাও জরুরি।
বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের ২১ বছর। আইনে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ব্যবস্থা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে আইনি কাঠামোর পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাই, বাল্যবিয়ের আয়োজন সম্পর্কে দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ জরুরি
কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি। বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকলে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া কমাতে বৃত্তি, দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা এবং বিদ্যালয়ে যাতায়াতের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার পাশাপাশি মেয়েদের প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও আয় করার সক্ষমতা বাড়ে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও বিস্তৃত হয়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী কন্যাশিশু এবং দুর্গম বা জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মেয়েদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা জরুরি।
জাতিসংঘের মতে, মেয়েদের অধিকারে বিনিয়োগ বলতে শুধু শিক্ষার ব্যয় বহন করাকে বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সেবা, আইনি সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ এবং নীতিনির্ধারণে কিশোরীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যেসব সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, সেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মেয়েদের মতামত ও নেতৃত্বের সুযোগও দিতে হবে।
কন্যাশিশুর অধিকার মানে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর গৃহীত ৬৬/১৭০ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর এই দিনে কন্যাশিশুদের অধিকার ও বৈষম্য দূর করার বিষয়টি বিশ্বজুড়ে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।
এ বছরের প্রতিপাদ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধের পাশাপাশি মেয়েদের অধিকারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বার্তায় বলা হয়েছে, মেয়েদের বিদ্যালয়ে রাখা, পরিবারের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো, আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতি বদলানোর মাধ্যমে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে কন্যাশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, নেতৃত্ব ও অধিকার নিয়ে আলোচনা, প্রচারাভিযান ও সচেতনতামূলক আয়োজন করা হয়। তবে এক দিনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, সরকার ও বেসরকারি সংস্থার ধারাবাহিক উদ্যোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি সমান সুযোগ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। একটি মেয়ে যেন দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ বা বৈষম্যের কারণে নিজের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত না হয়—সেই পরিবেশ তৈরি করাই এ দিবসের মূল বার্তা। বাল্যবিয়ে বন্ধ, মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে মেয়েরা নিজেদের জীবন গড়ার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।