ইসরায়েলের নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করে দেশটিগামী ফ্লাইটে ৩১টি দেশের নাগরিক ও দ্বৈত নাগরিকত্বধারী পাইলট এবং কেবিন ক্রুদের দায়িত্ব দেওয়া বন্ধ করছে ফরাসি বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স। তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান ও পাকিস্তানের মতো দেশ রয়েছে। ফরাসি নাগরিকত্ব থাকলেও তালিকাভুক্ত কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা এ বিধিনিষেধের আওতায় পড়বেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। ফ্রান্সে বিমান সংস্থাটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো। তবে এয়ার ফ্রান্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্টের ১০ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ তথ্য জানায়। মিডিয়াপার্টের হাতে আসা এয়ার ফ্রান্সের একটি অভ্যন্তরীণ বার্তায় বলা হয়েছে, ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয় দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশকারী ফ্লাইটের ক্রুদের নাগরিকত্বের বিষয়ে নতুন বিধিনিষেধ দিয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেসব দেশের নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কেউ ইসরায়েলের আকাশসীমায় প্রবেশকারী ফ্লাইটে ক্রু হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ফলে ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা কোনো কর্মীর অন্য নাগরিকত্বটি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকলেও তিনি বিধিনিষেধের আওতায় পড়বেন।
মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ার ফ্রান্স কর্মীদের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য জানাতে বলেছে। নির্দেশনা না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়ার সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে নির্দেশনায় কোনো ধর্মের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। বিধিনিষেধটি ধর্মের পরিবর্তে জাতীয়তা ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও তালিকায় মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বহু দেশের নাগরিক থাকায় এ সিদ্ধান্তের বৈষম্যমূলক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এন১২-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন নির্দেশনাটি জারি করে। এর পেছনে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখানো হয়েছে।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে গুরুতর নিরাপত্তা-ঘটনা ঘটে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওমানের নাগরিক সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং সেটিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের টার্মিনালে বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার সময় তিনি উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করেন। পরে ক্রু ও যাত্রীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক শহরে জরুরি অবতরণ করে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে।
এ ঘটনার পরই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ক্রুদের নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিধিনিষেধ জোরদার করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩-এর বরাতে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, দেশটির অন্তত একটি বিমান সংস্থা প্রায় ২ হাজার ৫০০ পাইলট ও কেবিন ক্রুর অতীত যাচাই শুরু করেছে।
এয়ার ফ্রান্সের ক্ষেত্রে নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের ফলে যেসব কর্মীর একাধিক দেশের নাগরিকত্ব রয়েছে, তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগও সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্য নাগরিকত্বের কারণে কর্মীদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি ফ্রান্সের আইন ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে এয়ার ফ্রান্সের বক্তব্য জানতে চাইলেও প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি। ফলে বিধিনিষেধটি কীভাবে কার্যকর করা হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তথ্যসূত্র: মিডিয়াপার্ট, মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।