চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ক্লাস শুরুর পাঁচ দিনের মাথায় আবারও ‘সর্বাত্মক শাটডাউন’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের অনুপস্থিতিতে তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেনকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে রোববার সন্ধ্যায় এ ঘোষণা দেন তাঁরা। সোমবার এক দিনের জন্য এ কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আগের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা ৩৬ দিনের শাটডাউন কর্মসূচির পর বুধবার ক্লাসে ফিরেছিলেন শিক্ষার্থীরা। নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার যে শর্ত তাঁরা দিয়েছিলেন, ডিনকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সেই অবস্থানের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি সভায় অংশ নিতে সোমবার ঢাকায় থাকবেন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। এ কারণে রোববার বিকেলে অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেনকে রুটিন দায়িত্ব দেন তিনি।
রোববার সন্ধ্যায় দেওয়া বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অচলাবস্থার পর নিজেদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরেছিলেন। তবে তাঁদের স্পষ্ট অবস্থান ছিল, নবনিযুক্ত উপাচার্যকে তাঁরা মেনে নেননি এবং ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে তাঁর কোনো হস্তক্ষেপ থাকতে পারবে না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অন্য একজনকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থেকেও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সোমবার শাটডাউন কর্মসূচি পালন করবেন তাঁরা।
এর আগে রোববার বেলা ৩টার দিকে চুয়েট মিলনায়তনে শিক্ষার্থীরা সভা করেন। পরে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তাঁরা।
আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে নিজেদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তাঁরা ক্লাসে ফিরেছিলেন। কিন্তু পূর্বঘোষিত অবস্থান উপেক্ষা করে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব অন্য একজনকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁদের আন্দোলন চলবে।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, ইউজিসির দাপ্তরিক কাজে তিনি ঢাকায় যাচ্ছেন এবং পরদিন ফিরে আসার আশা করছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ডিনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হওয়ায় অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন দাপ্তরিক প্রয়োজনে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন।
চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর। নিয়োগের ৫৬ দিনের মাথায় আগের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
একই দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি ঘোষণা করে শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনগুলো। আন্দোলনের মধ্যেই ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনে উপাচার্য পদে যোগ দেন অধ্যাপক শরীফুল আলম। পরে ১২ অক্টোবর সকালে প্রথমবারের মতো নিজ কার্যালয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা দুপুরে উপাচার্য ভবনে তালা দেন। এতে তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের সহায়তায় অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন তিনি।
আন্দোলনের মধ্যে ২৫ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফেরার আগ্রহের কথা জানান। ওই দিন সাধারণ সভা শেষে শিক্ষক সমিতিও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত না করার স্বার্থে একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথ বিবৃতিতে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত জানায়।
তবে নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি বহাল থাকবে বলে জানিয়েছিল শিক্ষক সমিতি। শিক্ষার্থীরাও আগেই সতর্ক করেছিলেন, নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে এসে দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ নিলে তাঁরা আবার শাটডাউন ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনে ফিরবেন।
রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণায় চুয়েটে একাডেমিক কার্যক্রম আবারও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্লাসে ফেরার উদ্যোগের স্থায়িত্ব এখন নির্ভর করছে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের সমাধান এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমঝোতার ওপর।