বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের উন্নয়ন এবং খেলাধুলাকে সামাজিক পরিবর্তনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে ফিফার বিশেষ আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ‘ফুটবল ফর স্কুলস’ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ডিরেক্টর ফ্রাঙ্ক লুইস বার্টোলোমেজ কাস্তিলোর সৌজন্য সাক্ষাতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশে ‘ফুটবল ফর স্কুলস’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, বিদ্যালয় পর্যায়ে ফুটবলের প্রসার, তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা এবং খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
আসন্ন ফিফা নারী বিশ্বকাপের মূল ভাবধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচির প্রথম ধাপে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং শিশু সুরক্ষা। পরবর্তী ধাপে সরকারের চাহিদা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্যানিটেশন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও কর্মসূচিতে যুক্ত করা হবে।
শিক্ষকদের জন্য সহজ ও ব্যবহারিক কারিকুলাম
কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহজে এটি পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা। শুধু শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকই নন, বিদ্যালয়ের যেকোনো সাধারণ শিক্ষক যাতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব সেশন পরিচালনা করতে পারেন, সেজন্য একটি বিশেষায়িত ও সহজবোধ্য কারিকুলাম তৈরি করা হবে।
একই সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের ভবিষ্যতে গ্রাসরুটস কোচিং কোর্স সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে। এর ফলে বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকরা শুধু ‘ফুটবল ফর স্কুলস’-এর সামাজিক ও শিক্ষামূলক সেশন পরিচালনাতেই নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল প্রশিক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
বিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্যালয় থেকে সম্ভাবনাময় ও সুপ্ত ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও বিকাশের সুযোগ তৈরি করা হবে।
স্থানীয় মালিকানা থাকবে বাফুফে ও মন্ত্রণালয়ের
‘ফুটবল ফর স্কুলস’ কর্মসূচিটির পূর্ণাঙ্গ স্থানীয় মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হাতে। কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের জন্য বাফুফে একজন স্থানীয় প্রজেক্ট ম্যানেজার নিয়োগ করবে। ফিফা সরাসরি ওই কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দেবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় কর্মসূচিটির সামাজিক প্রভাবও নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যালয় পর্যায়ে ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে বৈঠকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
দুই ‘মাস্টার ইনস্ট্রাক্টর’ দিয়ে শুরু
কর্মসূচির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে টেকসই করতে বাংলাদেশ থেকে দুইজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে ‘মাস্টার ইনস্ট্রাক্টর’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক ও ইনস্ট্রাক্টরদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এভাবে ধাপে ধাপে একটি স্থানীয় প্রশিক্ষক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি মাস থেকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে ‘ফুটবল ফর স্কুলস’-এর পাইলট ফেজ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে তিন থেকে চার মাস কর্মসূচিটির কার্যক্রম ও প্রভাব পর্যালোচনা করা হবে। পাইলট পর্বের ফলাফল সন্তোষজনক হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিদ্যালয়ে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈঠকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফিফার এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ফুটবলের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা জরুরি। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব বিবেচনায় ‘ফুটবল ফর স্কুলস’ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।