- মার্কিন স্বার্থের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের লক্ষ্যবস্তু নিয়েও ভাবছে তেহরান; হরমুজ খুলতে সাত দিনের প্রস্তাব, কাতারের মাধ্যমে মার্কিন জবাব
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালালে আগের চেয়ে আরও ব্যাপক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। তবে ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন স্বার্থ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুও ইরানের পাল্টা জবাবের আওতায় আসতে পারে।
তিনজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে কী ধরনের এবং কতটা বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তা নিয়ে দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউইয়র্ক থেকে ফেরার পর এই প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, ইরান এবার প্রতীকী কোনো পদক্ষেপের জবাবে প্রতীকী প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাইছে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরান প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে এটি তাঁর বিশ্লেষণ, ইরানের আনুষ্ঠানিক নীতি ঘোষণা নয়।
ইরানের পরিকল্পনায় আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকেও প্রস্তুত রাখার বিষয়টি রয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন স্বার্থ এবং অঞ্চলটির বাইরের কিছু লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া বিস্তৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এর মধ্যেই কূটনৈতিক পথ খোলা রাখছে তেহরান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে সাত দিনের একটি আস্থাবর্ধক প্রস্তাব পাঠায়। প্রস্তাবের আওতায় যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ছাড় এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয় রয়েছে। বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা জানান। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জবাব ইরানের কাছে পৌঁছেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সেই জবাব পর্যালোচনা করছেন। কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনার পরবর্তী ধাপে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—দুই পক্ষ প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কোন ক্রমে বাস্তবায়ন করবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও দুই দেশের অবস্থানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটন আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, আগে তাদের উত্থাপিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে; এরপর পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ফলে যুদ্ধবিরতি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচিই সম্ভাব্য সমঝোতার অন্যতম কঠিন বিষয় হয়ে রয়েছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকার মতে, দীর্ঘ সময় মার্কিন অবরোধের মধ্যে থাকা ইরানের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়লে তা ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা সীমিত এবং সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইরানের জন্য অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সংঘাতে দেশটির তেল রপ্তানি, বাণিজ্য ও বৈদেশিক আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক প্রস্তুতি ও হরমুজে নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি চীনের পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করার খবরও বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
হরমুজের গুরুত্বের কারণে সামরিক উত্তেজনার প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত প্রকল্পাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা মারিস্কসের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে। হামলার উৎস ও প্রকৃতি তখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
এর আগে ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও নতুন করে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে আগের চেয়েও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। সেনাপ্রধান আমির হাতামি হরমুজ প্রণালির ওপর চাপকে দেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে সতর্কবার্তা দেন।
অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অভ্যন্তরীণ প্রভাব নিয়েও তেহরানে উদ্বেগ রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এক সাবেক সংস্কারপন্থি ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, নেতৃত্বের মধ্যে জানুয়ারির ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পুনরাবৃত্তি নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, মে মাসে যুদ্ধ শুরুর পর ছয় হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরাও ব্যাপক গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এসব তথ্যের বিষয়ে ইরান সরকারের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ইরান এখন একই সঙ্গে দুটি পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে—একদিকে নতুন মার্কিন হামলার জন্য সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো, অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনার সুযোগ ধরে রাখা। সাত দিনের আস্থাবর্ধক প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটনের জবাব তেহরানের হাতে পৌঁছালেও দুই দেশের মধ্যে প্রধান বিরোধগুলো এখনো রয়ে গেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, অবরোধ, তেল রপ্তানি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রশ্নে সমঝোতা না হলে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা এগোবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।