- রাকসু জিএসের নেতৃত্বে আসা নিয়ে প্রশ্ন; শিবির-ছাত্রশক্তির ভূমিকা ও জুলাই আন্দোলনের রাজনীতি নিয়েও সমালোচনা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারকে ‘উড়ে এসে নেতা হওয়া’ ব্যক্তিদের একজন বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি আম্মারের নেতৃত্বে আসা, জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও মন্তব্য করেন।
উমামা তাঁর স্ট্যাটাসে দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আগে দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যাদের ন্যূনতম সম্পর্ক ছিল না, তাঁদের কেউ কেউ পরে নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে সালাউদ্দিন আম্মারও রয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন উমামা। তাঁর অভিযোগ, ওই সময় সব ছাত্র সংগঠনকে বাদ দিয়ে শিবির ও ছাত্রশক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, এর ফলেই ৫ আগস্টের পর আন্দোলনের সঙ্গে আগে থেকে সম্পৃক্ততা না থাকা অনেক ব্যক্তি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
তবে এসব বক্তব্য উমামা ফাতেমার রাজনৈতিক মন্তব্য ও অভিযোগ। তিনি যে দাবিগুলো করেছেন, সেগুলোর সবগুলোর স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্ট্যাটাসে উমামা আরও কঠোর ভাষায় জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনীতি করা ব্যক্তিদের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যারা আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্রকে ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম’ ও শিবিরের হাতে বন্দি করছে, তাদের ওপর আল্লাহর গজব পড়ুক। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করা জনমত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ফেসবুকের প্রভাব নিয়ে উমামার বক্তব্য আরও বিস্তৃত। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তরুণদের কাছে ‘নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তিনি এ ধরনের প্রক্রিয়াকে ‘ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট’ বা পরিকল্পিত জনসমর্থন তৈরির সঙ্গে তুলনা করেন।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের প্রসঙ্গও টেনে আনেন উমামা। তাঁর বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনমতকে প্রভাবিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রভাব তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়েও স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেন উমামা। তিনি জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই বলে দাবি করেন এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা-সংক্রান্ত ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন। এসব মন্তব্যও তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে এসেছে; সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রতিক্রিয়া ওই স্ট্যাটাসে ছিল না।
উমামার বক্তব্যের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সালাউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আম্মার ২০২৫ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ‘সাথী’ ছিলেন এবং পরে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর ওই পদ বাতিল করা হয়। শিবিরের বিভিন্ন সময়ের তিনটি চিঠির বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকাশিত চিঠিগুলোতে আম্মারের বিরুদ্ধে পদ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ কোনো আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। শিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগের পর সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ‘সাথী’ পদ স্থগিত ও পরে বাতিল করা হয়।
অন্যদিকে, ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে সালাউদ্দিন আম্মার নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জামায়াত নেতা ড. খালিদুজ্জামানের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সে শিবিরের নাম যুক্ত করার বিষয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, অ্যাম্বুলেন্সটির জন্য তিনি আগে ওই জামায়াত নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
ফলে একই সময়ে আম্মারকে ঘিরে দুটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে সাবেক ছাত্র আন্দোলন নেত্রী উমামা ফাতেমা তাঁকে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে উঠে আসা নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন; অন্যদিকে শিবিরের প্রকাশিত নথিতে তাঁর সঙ্গে সংগঠনটির অতীত সাংগঠনিক সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। একই সময়ে আম্মার নিজেও জামায়াত-শিবিরের একটি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।
রাকসুর নেতৃত্বে আসার পর আম্মারকে ঘিরে এই বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর নির্দিষ্ট ভূমিকা, বিভিন্ন কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া এবং উমামার উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত।
উমামার ফেসবুক স্ট্যাটাস মূলত জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার, নতুন ছাত্র নেতৃত্বের উত্থান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তাঁর অসন্তোষ ও অবস্থান তুলে ধরেছে। আর আম্মারকে ঘিরে প্রকাশিত শিবিরের নথি তাঁর অতীত সাংগঠনিক সম্পর্কের একটি আলাদা দিক সামনে এনেছে। দুই ধরনের তথ্য মিলিয়ে বর্তমানে রাকসুর জিএসকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।