আবুধাবিতে প্রথম দিনে সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড বাংলাদেশের, ৮ উইকেটে ৩১৭; তিন ব্যাটারের ফিফটির পরও বড় সংগ্রহের সুযোগ হাতছাড়া
শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। তানজিদ হাসান তামিমের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে উড়ন্ত সূচনা, সাদমান ইসলামের ধৈর্যশীল ইনিংস আর লিটন দাসের ফিফটিতে আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারত স্মরণীয়। কিন্তু সম্ভাবনার সেই গল্প শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পেল না। ভালো শুরু করেও ইনিংস বড় করতে পারেননি একাধিক ব্যাটার। ফলে রেকর্ড গড়ার আনন্দের পাশাপাশি দিন শেষে রইল অতৃপ্তি।
শুক্রবার আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৮৪ ওভারে ৮ উইকেটে ৩১৭ রান। এই মাঠে টেস্টের প্রথম দিনে এটিই সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। এর আগে ২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম দিনে ৩ উইকেটে ৩০৭ রান করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রায় ১৬ বছর পর সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল বাংলাদেশ। তবে তিনটি অর্ধশতক এলেও কোনো ব্যাটার ইনিংসকে শতরানে নিতে পারেননি। <Cite refs={["turn577945search0","turn577945search3"]}/>
উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক মনে হওয়ায় টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। গরমের মধ্যে পরের দিনগুলোতে পিচে স্পিনের প্রভাব বাড়তে পারে—এমন ভাবনা থেকে একাদশে জায়গা পান অফ স্পিনার নাঈম হাসানও। অন্যদিকে আফগানিস্তানের বোলিং আক্রমণে অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন তানজিদ। দ্বিতীয় ওভারে মোহাম্মদ সালিমের বলে গ্লান্স করে বাউন্ডারি মেরে শুরু। এরপর ইয়ামিন আহমাদজাইয়ের বলে পরপর দুটি চার। একই বোলারের বল ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে কভারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন ছক্কা। স্পিনার হাশমতউল্লাহ শাহিদির বলেও চার-ছক্কা হাঁকিয়ে রানের গতি ধরে রাখেন বাঁহাতি এই ওপেনার। মাত্র ৪১ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট ফিফটি তুলে নেন তানজিদ। তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে দশম ওভারেই বাংলাদেশের রান পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যায়। অন্য প্রান্তে সাদমান শুরুতে একটু ধীরগতির হলেও ধীরে ধীরে থিতু হন। ব্যক্তিগত পাঁচ রানে একবার জীবনও পান তিনি।
দুজনের ব্যাটে উদ্বোধনী জুটি পৌঁছে যায় ১২৪ রানে। লাঞ্চের আগেই সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন তানজিদ। কিন্তু ইসমাত আলমের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে অপ্রয়োজনীয় শট খেলতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তিনি। ৮টি চার ও ৪টি ছক্কায় ৭১ বলে ৮৩ রান করে থামে তাঁর ঝলমলে ইনিংস। বড় সংগ্রহের ভিত গড়লেও সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে যায়।
তানজিদের বিদায়ের পর সাদমানের সঙ্গে জুটি বাঁধেন মুমিনুল হক। দুজন মিলে দ্বিতীয় উইকেটে যোগ করেন ৬০ রান। আট ইনিংস পর ফিফটির দেখা পান সাদমান। অভিজ্ঞ এই ওপেনারের ব্যাটে তখন বড় ইনিংসের আশা দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু লাঞ্চের পর মোহাম্মদ সালিমের শর্ট বলের ফাঁদে পড়েন তিনি। পুল করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন ৬৭ রান করা সাদমান। তাঁর নবম টেস্ট ফিফটিও রূপ নেয়নি বড় ইনিংসে।
এরপর মুমিনুল ও শান্তর ব্যাটে এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। কাইস আহমাদের বলে ছক্কা মেরে শুরু করেন অধিনায়ক। কিন্তু চা-বিরতির আগে দ্রুত বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ইয়ামিনের বলে আলতো ড্রাইভ করতে গিয়ে শর্ট কভারে ক্যাচ দেন ৩৯ রান করা মুমিনুল। পরের ওভারেই ইয়র্কারধর্মী বলে বোল্ড হন মুশফিকুর রহিম—কোনো রানই করতে পারেননি তিনি। এরপর কাইসের লেগ স্পিনে ব্যাটের বাইরের কানায় বল লাগিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন শান্ত। চার রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
সেই চাপ সামাল দেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংয়ে ষষ্ঠ উইকেটে ৬২ রান যোগ করেন তাঁরা। মিরাজ ২৪ রান করে ইসমাত আলমের বলে বোল্ড হলে ভাঙে জুটি। ততক্ষণে লিটন নিজের ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। সাম্প্রতিক টেস্টে টানা তিনবার শূন্য রানে আউট হওয়ার পর তাঁর ব্যাটে আসে স্বস্তির ফিফটি। কিন্তু লিটনও ইনিংস বড় করতে পারেননি। সালিমের শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ডিপ ফাইন লেগে ক্যাচ দেন তিনি। ৪টি চারে ৮৯ বলে ৫৩ রান করেন বাংলাদেশের উইকেটকিপার-ব্যাটার। একই ওভারে নিখুঁত ইয়র্কারে হাসান মাহমুদকে বোল্ড করে দিনের তৃতীয় উইকেট তুলে নেন সালিম।
দিনের শেষ দিকে নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলাম আর কোনো উইকেট পড়তে দেননি। নাঈম ১১ এবং তাইজুল ৪ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেন। আফগানিস্তানের হয়ে সালিম ৭০ রানে ৩ উইকেট নেন। ইসমাত আলম ও ইয়ামিন আহমাদজাই পান দুটি করে উইকেট; কাইস আহমাদের শিকার একটি।
প্রথম দিনের ৩১৭ রান বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো সংগ্রহ। কিন্তু ১২৪ রানের উদ্বোধনী জুটি এবং একপর্যায়ে বড় ইনিংসের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পরও আট উইকেট হারানোয় তৃপ্তি পুরোপুরি আসছে না। দ্বিতীয় দিনে নাঈম ও তাইজুলের ব্যাটে যতটা সম্ভব রান যোগ করা এবং এরপর বোলারদের দিয়ে আফগানিস্তানকে চাপে ফেলাই এখন বাংলাদেশের লক্ষ্য।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৮৪ ওভারে ৩১৭/৮ (সাদমান ৬৭, তানজিদ ৮৩, মুমিনুল ৩৯, শান্ত ২৯, মুশফিক ০, লিটন ৫৩, মিরাজ ২৪, নাঈম ১১*, হাসান ২, তাইজুল ৪*; ইয়ামিন ১৬-৩-৬২-২, সালিম ১৯-১-৭০-৩, শাহিদি ৩-০-২৪-০, ইসমাত ১২.৪-৫-২০-২, জিয়া ১৯-১-৭৭-০, কাইস ১৪.২-১-৬০-১)।
(প্রথম দিন শেষে)