ফুটবলের ব্যক্তিগত পুরস্কারের সবচেয়ে আলোচিত নাম ব্যালন ডি’অর। মাঠের পারফরম্যান্স, ব্যক্তিগত অর্জন ও দলীয় সাফল্যের হিসাব পেরিয়ে এই পুরস্কার জয়ের লড়াইয়ে আলোচনায় আসে ভোটারদের মূল্যায়নও। কিন্তু পুরস্কারটির নেপথ্যে প্রার্থিতার পক্ষে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছেন ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকীর সাবেক প্রধান প্যাসকেল ফেরে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফেরে জানান, এক মনোনীত ফুটবলারের এজেন্ট তাঁর সঙ্গে দেখা করে নিজের মক্কেলের সাফল্যের প্রশংসা করেন। একপর্যায়ে ওই ফুটবলারের প্রার্থিতা ব্যালন ডি’অরের ভোটারদের কাছে তুলে ধরার অনুরোধও জানান। ফেরে তাতে রাজি হননি। পরে একটি ফোনকলের জন্য তিনি টেবিল ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য সরে গেলে ফিরে এসে দেখেন, এজেন্ট চলে গেছেন। টেবিলে পড়ে আছে একটি খাম।
ফেরে জানান, খামটি খুলে দেখেননি তিনি। সেটি নিয়ে রেস্তোরাঁর অভ্যর্থনাকক্ষে জমা দিয়ে আসেন। খামের ভেতরে কী ছিল, তা তাঁর জানা নেই। ঘটনাটি ঠিক কোন বছরের, সে বিষয়েও তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি। ফলে ঘটনাটিকে ঘুষের প্রস্তাব বলে সন্দেহ করার অবকাশ থাকলেও খামের ভেতরে অর্থ ছিল—এমন দাবি করার মতো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ফ্রান্স ফুটবলের সাবেক এই কর্মকর্তা ব্যালন ডি’অরের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। পুরস্কারটির নেপথ্যের নানা ঘটনা নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে। সেখানে শুধু সন্দেহজনক খামের ঘটনাই নয়, বিজয়ীদের কাছে সুখবর পৌঁছে দেওয়ার মুহূর্ত এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টার বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি।
২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচকে ব্যালন ডি’অর জয়ের খবর জানানোর অভিজ্ঞতাও স্মরণ করেছেন ফেরে। তাঁর বর্ণনায়, খবরটি শোনার পর মদ্রিচ কিছুক্ষণ নীরব হয়ে যান। পরে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি এই মিডফিল্ডার। দীর্ঘদিনের ফুটবলজীবনে এমন স্বীকৃতি পাওয়ার মুহূর্ত যে একজন খেলোয়াড়ের কাছে কতটা আবেগের হতে পারে, সেই ঘটনাও তারই উদাহরণ।
২০২২ সালে করিম বেনজেমাকে বিজয়ী হওয়ার খবর জানানোর অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। ফেরের ভাষ্য অনুযায়ী, খবরটি শুনে বেনজেমা প্রথমে বেশ শান্ত ছিলেন। পরে বেনজেমা তাঁকে জানান, তখন তিনি সতীর্থদের সঙ্গে ছিলেন। পুরস্কারের খবরটি গোপন রাখার জন্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করে তাঁকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে হয়েছিল। ফলে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় যে বিস্ময় বা আবেগ দেখা যায়নি, তার পেছনে ছিল খবরটি গোপন রাখার চাপ।
ব্যালন ডি’অর নিয়ে ফেরের সাম্প্রতিক আলোচনার আরেকটি বিষয় হলো, পুরস্কারপ্রত্যাশীদের প্রকাশ্য প্রচার-প্রচারণা। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে পারিসিয়েনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ভোটারদের বারবার বোঝানোর চেষ্টা যে কোনো খেলোয়াড়ই সেরা—তা উল্টো বিরক্তির কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, ভোটাররা অভিজ্ঞ এবং তাঁরা মাঠের পারফরম্যান্স বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
এই প্রসঙ্গে কিলিয়ান এমবাপের মতো তারকাদের পুরস্কার ঘিরে প্রকাশ্য প্রচারণার কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ফেরের বক্তব্যের মূল কথা কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে অভিযুক্ত করা নয়; বরং ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে অতিরিক্ত প্রচার কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত পুরস্কারের ক্ষেত্রে মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি ভোটারদের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে প্রার্থিতার পক্ষে প্রচার, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে কোনো অনুরোধ বা সন্দেহজনক আচরণের বর্ণনা আর পুরস্কারের ভোটে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
ফেরের বর্ণনায় উঠে আসা খামের ঘটনাটিও সেই পার্থক্য মনে করিয়ে দেয়। একজন এজেন্ট প্রার্থিতা প্রচারের অনুরোধ করেছিলেন এবং পরে একটি খাম রেখে চলে গিয়েছিলেন—এটুকুই তাঁর বক্তব্য থেকে জানা যায়। খামের ভেতরে কী ছিল, সেটি অর্থ ছিল কি না কিংবা এ ঘটনার সঙ্গে ব্যালন ডি’অরের ভোটে কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।