একদিকে ওপেনার সাদমান ইসলামের চোট, অন্যদিকে দিনের প্রথম সেশনেই একের পর এক উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে বাংলাদেশ। সিলেট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আবারও হারের শঙ্কা যখন ঘনীভূত হচ্ছিল, তখনই ত্রাতা হয়ে দাঁড়ালেন তাওহীদ হৃদয়। একপ্রান্ত আগলে রেখে লেজের সারির ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে খেললেন অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়ে গড়লেন ইতিহাস। তাঁর ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসে ভর করে দিন শেষে ম্যাচে স্বস্তি ফিরেছে স্বাগতিক শিবিরে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানের জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৩৮৬ রান করে অলআউট হয়েছে স্বাগতিকরা। ৩০ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে দিন শেষে ৪ ওভারে বিনা উইকেটে ৭ রান করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফলে এখনো ২৩ রানে পিছিয়ে সফরকারীরা। ব্র্যান্ডন কিং ৫ ও জসুয়া ডি সিলভা ২ রানে অপরাজিত থেকে চতুর্থ দিনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড এত দিন ছিল মুশফিকুর রহিমের দখলে। ২০১৮ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৯ রান করেছিলেন তিনি। এবার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই সেই রেকর্ড ভেঙে দিলেন হৃদয়। ৩৫৯ বল মোকাবিলা করে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ২৪২ রান করে অপরাজিত থাকেন এই ব্যাটার। মুশফিকের চেয়ে ২৩ রান বেশি করে দেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন মালিক হয়েছেন তিনি।
শুধু রেকর্ড ভাঙাই নয়, টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়ার কীর্তিও গড়েছেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে এর আগে কোনো ব্যাটার এই কীর্তি গড়তে পারেননি। মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের পর চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তিও এখন তাঁর। পাশাপাশি আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির মালিক হয়েছেন হৃদয়। এক ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১১টি ছক্কার রেকর্ডও এখন তাঁর দখলে।
দিনের শুরুতে ৩ উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। কিন্তু একে একে শীর্ষসারির ব্যাটাররা ফিরে গেলে বিপর্যয় আরও ঘনীভূত হয়। একপর্যায়ে ১৮২ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে বসে স্বাগতিকরা। সেখান থেকে দলের হাল ধরেন হৃদয়। অষ্টম উইকেটে তাইজুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ১৬৭ বলে ১১৭ রানের জুটি গড়েন তিনি। এরপর নবম উইকেটে তাসকিন আহমেদের সঙ্গে যোগ করেন আরও ৮৭ রান।
শেষ পর্যন্ত ১২ রান করে তাসকিন আউট হলে থামে বাংলাদেশের ইনিংস। তবে একপ্রান্তে অবিচল থেকে ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন হৃদয়। তাঁর ব্যাটিং দৃঢ়তায় ১৮২ রানে ৭ উইকেট হারানোর পরও ৩৮৬ রানের সংগ্রহ দাঁড় করাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। দলের পক্ষে মুশফিক ৩৪, তাইজুল ২২, নাজমুল হোসেন শান্ত ১৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তানজিদ হাসান ১৬ করে এবং তাসকিন ১২ রান করেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে জোমেল ওয়ারিক্যান ১০৪ রানে ৪ উইকেট নেন। জেডেন সিলস পান ২ উইকেট।
দিনের শেষ ভাগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রথম ওভারেই দুবার রিভিউ নিয়ে সফল হতে পারেননি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। এরপর আলোকস্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই দিনের খেলা শেষ করেন আম্পায়াররা।
সব মিলিয়ে ৩০ রানের প্রথম ইনিংস লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দিন শেষে ২৩ রানে পিছিয়ে রয়েছে। চতুর্থ দিনে এই ব্যবধান বাড়ানো কিংবা দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের সামনে। তাওহীদ হৃদয়ের ঐতিহাসিক ইনিংসের পর এখন সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচে কতটা এগিয়ে যেতে পারে স্বাগতিকরা, সেটিই দেখার বিষয়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: প্রথম ইনিংস ৩৫৬; দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ ওভারে ৭/০ (ব্র্যান্ডন কিং ৫*, জসুয়া ডি সিলভা ২*)।
বাংলাদেশ: প্রথম ইনিংস ১১১.৫ ওভারে ৩৮৬ (তাওহীদ হৃদয় ২৪২*, মুশফিকুর রহিম ৩৪, তাইজুল ইসলাম ২২, নাজমুল হোসেন শান্ত ১৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ১৬, তানজিদ হাসান ১৬, তাসকিন আহমেদ ১২; জোমেল ওয়ারিক্যান ৪/১০৪, জেডেন সিলস ২/৫৮)।