মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় আকারের অনুপ্রবেশ শুরু হয়। মানবিক কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে তোলা হয় বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী বসতি। কিন্তু নয় বছর পার হতে না হতেই সেই ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হত্যা, মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, মানবপাচার, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধের বিস্তার ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে সাড়ে চার হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ২৮৮টি। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭৭টি এবং আসামির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।
অপরাধের তালিকায় সবচেয়ে বড় অংশ মাদকসংক্রান্ত। এ ধরনের সাড়ে তিন হাজারের বেশি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৫ জনকে। অস্ত্র ও দস্যুতার ১৬৫ মামলায় আসামি ৩১২ জন। ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় আসামি ৫২১ জন। অপহরণের ৩০৬ মামলায় ৩৫৩ জন এবং মানবপাচারের চার শতাধিক মামলায় ৮৭৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নানা অপরাধের কথা তুলে ধরে কক্সবাজার জেলার , অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) নাজমুস সাকিব খান বলেছেন, ‘২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত গত নয় বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৮৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, রোহিঙ্গারা খুনোখুনি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মানবপাচার, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং ধর্ষণসহ ১৪ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত। গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে।’
অবশ্য এসব পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে ক্যাম্পের সব রোহিঙ্গাই অপরাধে জড়িত। বরং বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ঘিরে গড়ে ওঠা সশস্ত্র ও অপরাধী চক্রই পরিস্থিতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাস। ক্যাম্পের ভেতরের ঘনবসতি, পাহাড়ি দুর্গম এলাকা, সীমান্তের নৈকট্য এবং একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও অপহরণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
২০১৭ সালের পর থেকে ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কথা বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে তিনটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও সাতটি ডাকাত দলের সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তখন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), মাস্টার মুন্না গ্রুপসহ বিভিন্ন দলের নাম আলোচনায় আসে। একই প্রতিবেদনে ক্যাম্পভেদে একাধিক ডাকাত দলের তৎপরতার কথাও বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সূত্রের অনুসন্ধানে ক্যাম্পে আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তার তথ্য সামনে আসে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বড় ধরনের অন্তত ১০টি সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী এবং অর্ধশতাধিক ছোট-বড় ডাকাত দলের তৎপরতার দাবি করা হয়। এসব তথ্যের সবগুলোর স্বাধীন যাচাই অবশ্য সম্ভব হয়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো থেকে ক্যাম্পে সংঘবদ্ধ অপরাধের অস্তিত্ব স্পষ্ট বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।
ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ আধিপত্য ও অপরাধের নিয়ন্ত্রণ। মাদক পাচার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি এবং মানবপাচারের মতো অপরাধ থেকে অর্থ আয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। সাধারণ রোহিঙ্গারাও এসব সংঘাতের শিকার হচ্ছেন।
২০২২ সালে ক্যাম্পে আরসার সঙ্গে ‘ইসলামী মাহাজ’ নামে একটি গোষ্ঠীর বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই সময় একাধিক হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার পর ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। একই বছরের ২২ অক্টোবর ক্যাম্প-১৮-এর একটি মাদ্রাসায় ছয়জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে মাঝি, স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২১ সালে ক্যাম্পে ২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩২টিতে দাঁড়ায়। একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ছিল উদ্বেগজনক। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২২টি অগ্নিকাণ্ডের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ৬০টি নাশকতামূলক এবং ৬৩টির কারণ জানা যায়নি।
ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তারও অপরাধের মাত্রা বাড়িয়েছে। ২০১৯ সালের শুরু থেকে ২০২২ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করা হয় বলে সে সময় জানানো হয়েছিল।
এর পরও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা থামেনি। ২০২২ সালের জুনে উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পের দুই বাসিন্দাকে আমেরিকায় তৈরি এম-১৬ রাইফেল ও গোলাবারুদসহ আটকের ঘটনা ক্যাম্পে অস্ত্রের প্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা তখন জানিয়েছিলেন, সীমান্তের ওপার থেকে বিভিন্নভাবে অস্ত্র ক্যাম্পে প্রবেশ করছে এবং এসব অস্ত্র মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ক্যাম্পের অপরাধের সঙ্গে সীমান্তপারের মাদক ব্যবসার যোগসূত্রের কথাও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ৭৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৭১টি মামলায় ১৬৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ইয়াবা, অস্ত্র ও অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে বাহিনীটি।
উখিয়া থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রোহিঙ্গাসংক্রান্ত তিন হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৮৬২টি মামলা হয়েছিল।
অপরাধ দমনে ক্যাম্পে ব্লকভিত্তিক স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থাও চালু করা হয়। বিভিন্ন ক্যাম্পে হাজার হাজার রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী রাতে পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, এ ব্যবস্থার কারণে একপর্যায়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অন্যান্য অপরাধ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। তবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সিরাজ আমিন বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন। তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ক্যাম্পে নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনপদেও। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর চলাচলে তারা অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ক্যাম্পের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান, সীমান্তের অস্থিরতা, মাদক ও অস্ত্রের অবাধ প্রবাহ এবং প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ২০১৭ সালের পর নয় বছরেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। বরং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নতুন সংঘাতের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে ক্যাম্পে জনসংখ্যার চাপও বেড়েছে।
উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মানবিকতা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে আমাদের দেশে। এটি খুব সাময়িক। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছর এভাবে বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে থাকবে তারা, এটি মেনে নেওয়া যায় না। কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হবে। এখানে তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েছে। তাদের দমানো যাচ্ছে না।’

উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম. গফুর উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা আর রোহিঙ্গাদের এখানে দেখতে চাই না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের আতঙ্ক কাটবে না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে হতাশা যত বাড়বে, অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংগ্রহের সুযোগও তত বাড়তে পারে। আর সে কারণে ক্যাম্পের নিরাপত্তা সংকটকে শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে সীমান্ত, মাদক, মানবপাচার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
পর্ব - ০১ : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোপনে বাড়ছে বহুবিবাহ, বেশি ঝুঁকিতে নারী ও শিশুরা