দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা

রোহিঙ্গা সংকট: প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় প্রায় ১২ লাখ, বাড়ছে নিরাপত্তা ও মানবিক চাপ

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯
 ছবি:

প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এখনো শুরু করা যায়নি। মিয়ানমারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা, তালিকা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পরও একজন রোহিঙ্গাকেও বড় পরিসরে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সংকটটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১। এর মধ্যে কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে রয়েছেন ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন এবং ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা। রোববার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ প্রচেষ্টা ও কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এই সংকট দীর্ঘায়িত করা যাবে না; এখন জরুরি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি ‘রূপান্তরকালীন কৌশল’-এ যেতে হবে। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে না, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ক্যাম্পের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং নিয়ন্ত্রিত যাতায়াতব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।

তবে প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত জুনে সংসদে জানিয়েছিলেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে সরকার। তাঁর ভাষায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের গতি মূলত রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

মিয়ানমারের পক্ষ থেকেও প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সাম্প্রতিক অগ্রগতির দাবি এসেছে। আগস্টে দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকার জানায়, বাংলাদেশে থাকা ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে তারা রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন এগিয়ে নেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়েছে।

এখানেই প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের বাস্তবতার বড় ফারাকটি স্পষ্ট হচ্ছে। ঢাকা দ্রুত যাচাই শেষ করে প্রত্যাবাসন শুরুর ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে শর্ত হিসেবে সামনে আনছে। ফলে তালিকা যাচাইয়ের অগ্রগতি হলেও বাস্তবে মানুষ ফেরানোর প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার আওতায় তথ্য যাচাই দ্রুত শেষ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া যেন আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না থাকে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে নিরাপত্তা, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও অধিকারের স্বীকৃতি, আইনি মর্যাদা, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—তাঁরা ফিরে গেলে কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে বসবাস করবেন। রাখাইনের বড় অংশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দিয়ে প্রত্যাবাসনের বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ এখন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকেও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে।

সংকটের আরেকটি দিক হলো ক্যাম্পে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি। দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, নয় বছর পরও একজন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসিত হয়নি। একই সময়ে ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ছে এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতিও যুক্ত। মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘাত চলতে থাকায় নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় মাদক, মানবপাচার ও অস্ত্র পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। আগস্টে আরাকান আর্মির হাতে আটক ২৪ জেলেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়; তাঁদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি ও ছয়জন রোহিঙ্গা ছিলেন। নাফ নদীর সীমান্ত পরিস্থিতির জটিলতাও এতে স্পষ্ট হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক সহায়তার সংকট। জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে। এই আবেদন ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, ফলে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

অর্থাৎ ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা সংকট আর শুধু শরণার্থী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও অস্ত্র পাচার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি, রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত এবং প্রত্যাবাসনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের সামনে তাই একসঙ্গে দুটি চাপ—রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান বের করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ঢাকার মূল বার্তাও এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে: রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা সমাধান নয়; আবার নিরাপত্তাহীন রাখাইনে তড়িঘড়ি ফেরত পাঠানোও গ্রহণযোগ্য নয়।

টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন এমন একটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া, যেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, পরিচয়, নাগরিক অধিকার, চলাচলের স্বাধীনতা এবং জীবিকা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান ও আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে রাখতে হবে।

নয় বছর পর এসে বাংলাদেশের অবস্থান তাই মানবিক সহায়তা থেকে প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক কূটনীতির দিকে আরও স্পষ্টভাবে এগোচ্ছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের দরজা খুলবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
 

সারাবছর খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ মাউশির

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও অর্ধশত মামলা বিচারাধীন

আমরা দেশকে পুনর্গঠন করতে চাইলে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীরবিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

‘হৈ হৈ, রৈ রৈ, বিএনপিরা গেলি কই’—স্লোগানে ছাত্রলীগের মিছিল

ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে আর্থিক অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী

তিতুমীর কলেজে ফ্রি রিসার্চ মেথডলজি প্রোগ্রাম, সাদিয়ার চিকিৎসায় সহায়তার আহ্বান

বাব-এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইয়েমেনে শত শত সেনা পাঠাল ইরান

জাতি এখন সবচেয়ে বড় সংকটে আছে : ডা. শফিকুর রহমান

১০

পত্নীতলায়  চোরাই মালামালসহ আটক ২

১১

নওগাঁয় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, তদন্তে মিলল সত্যতা

১২

আহত ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিনকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী

১৩

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ১০ হাজার কোটি ডলারে নিতে চায় রাশিয়া-ভারত

১৪

রাজধানীর একটি বাসায় মাটি খুঁড়ে নিখোঁজ ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার

১৫

মিয়ানমারে ড্রোন হামলার পর বন্ধ বিমানবন্দর

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৩

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত