পরিকল্পনা অনুযায়ী ২২-২৩ আগস্ট তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর হলে তা নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে
দিল্লিতে বিমসটেক সম্মেলনের আগে আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হতে পারে। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য সফরের তারিখ ২২ ও ২৩ আগস্ট। তবে এখনো সফরের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এরই মধ্যে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দিনের এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। সেখানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের পর এই সফরকে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে ব্রিকসের ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। গত সপ্তাহে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বক্তব্যে অবশ্য দ্বিপক্ষীয় সফরকে ব্রিকস সম্মেলনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরের প্রস্তুতি নীরবে এগিয়ে চলছে। গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে ২৭ বা ২৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তার আগেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারত সফরে যেতে পারেন।
সম্ভাব্য এই সফরে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির প্রথম বৈঠকের দিকে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দুই দেশ থেকেই দেখা যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ নিয়ে অবশ্য এখনো দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
ভারত বলে আসছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা ‘যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়’ পর্যালোচনা করছে। তবে তাঁকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো দেয়নি নয়াদিল্লি।
শেখ হাসিনা সম্প্রতি দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। ঢাকার পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগ, দণ্ডিত পলাতক আসামিকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল অবশ্য বলেছেন, ওই অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যকেও সরকার সমর্থন করে না।
১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি তাঁকে ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার বিষয়েও নয়াদিল্লির সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকেও শেখ হাসিনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক যেন শুধু এই একটি প্রশ্নের মধ্যে আটকে না যায়, সে বিষয়টিও দুই পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান এমন বার্তা দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অগ্রগতির ওপর সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয়টি ‘পঞ্চাশ-পঞ্চাশ ভাগ’ নির্ভর করছে। এই শর্ত পূরণ না হলে সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনেও তারেক রহমান অংশ নাও নিতে পারেন।
তবে ওই বৈঠকের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেছেন, দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়—এমন কোনো সমস্যা নেই।
শেখ হাসিনার বিষয়টির পাশাপাশি সম্ভাব্য বৈঠকে পানি, বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দুই দেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ—সব মিলিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
পানি বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন সীমান্ত এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে নয়াদিল্লির কাছে ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগেও দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখিয়েছে। গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের অপেক্ষায় আছেন। তাঁর ভাষায়, “আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই যে—ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হলে উইন-উইন সিচুয়েশন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা শুধু সীমান্ত ভাগাভাগি করি না, আমরা স্বপ্নও ভাগাভাগি করি। ... আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিন খুবই ভালো হবে। ইস্যুজটা শর্ট-আউট করতেই হবে, দুদিক থেকে। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী।”
তবে সম্ভাব্য এই সফরেই বাংলাদেশ-ভারতের সব অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশা নেই। বরং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, সীমান্ত ও যোগাযোগের মতো বিষয়ে সরাসরি আলোচনা শুরুর সুযোগ হিসেবে সফরটিকে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এনডিটিভির ভাষ্য অনুযায়ী, সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২২-২৩ আগস্ট তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর হলে তা নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোনো একটি ইস্যুকে যেন পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না দেওয়া।