দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্কবার্তা; ভারত বলছে, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যাতে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকা বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক অস্বস্তির সৃষ্টি করতে পারে।
সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এ অনুরোধ জানান। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য নিয়ে উদ্বেগ
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী আগামী ৫ আগস্ট দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি বাংলাদেশের নজরে এসেছে। এ প্রসঙ্গ তুলে হুমায়ুন কবির ভারতীয় হাইকমিশনারকে বলেন, শেখ হাসিনাসহ নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে না পারেন কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারেন। তিনি বলেন, এমন কোনো কর্মকাণ্ড বর্তমান সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভারতের আশ্বাস
বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়ে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারত সরকার সতর্ক থাকবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। পাশাপাশি নিয়মিত সংলাপ এবং গঠনমূলক কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর অবস্থান
একই দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডিত ও পলাতক আসামি। এমন একজন ব্যক্তি ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে এ ধরনের আয়োজন দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চলমান প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমরা ভারতের সঙ্গে কৌশলগত, স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সম্পর্ক চাই। তবে এমন একটি বিষয়ে দিল্লির অবস্থান পরিষ্কার হওয়া জরুরি।”
শামা ওবায়েদ আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান সময়ে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার চায় না, কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হোক।
সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হয়েছে এবং দুই দেশ ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কাজ করছে।
তার ভাষায়, “বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের জনগণ কেউই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি চায় না। বরং পারস্পরিক স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও গভীর হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতেই অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যর্পণ চেয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। একই সময়ে ভারতের মাটিতে তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডকে ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পানি বণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে রাজনৈতিক আশ্রয় এবং বিদেশের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রশ্নটি ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি সংবেদনশীল কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়ে ভারতের পরবর্তী অবস্থানই এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।