‘শিক্ষাঝুঁকিতে’ দেড় লাখ রোহিঙ্গা শিশু, সংকটের অন্ধকারেও আশার আলো

বিশেষ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১০
ছবি : সংগৃহীত ছবি:
ছবি : সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি, জরাজীর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষকসংকট এবং সামাজিক বাধার কারণে দেড় লাখের বেশি শিশু সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষার বাইরে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, অপহরণ, নির্যাতন ও গভীর মানসিক ট্রমার ঝুঁকি। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজুমা, সালমা, মেহেরজান ও সামুদার মতো কিশোরীরা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে; কোথাও বাবার সমর্থন, কোথাও মেয়েদের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষ, আবার কোথাও ইতিবাচক অভিভাবকত্বের উদ্যোগ তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করছে।

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। শিবিরের অস্থায়ী আশ্রয়, ঘনবসতি ও অনিশ্চিত জীবন তাদের স্বাভাবিক শৈশবকে কঠিন করে তুলেছে। খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার সংকটের পাশাপাশি শিক্ষা ও শিশুসুরক্ষা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শিক্ষাকেন্দ্র চালু রাখা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

২০২৫ সালের জুনে ইউনিসেফ সতর্ক করেছিল, অর্থসংকটের কারণে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষা গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটির সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া শিশুদের অন্তত ৮৩ শতাংশ এই সংকটের প্রভাবের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিবিরে প্রায় চার লাখ শিশু স্কুলগামী বয়সের হলেও দেড় লাখের বেশি শিশু কোনো ধরনের সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষার আওতায় নেই। তাদের কেউ কেউ বেসরকারি শিক্ষা কেন্দ্র বা স্থানীয় কওমি মাদ্রাসায় পড়লেও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই।

শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে অর্থের অভাবে নতুন পাঠ্যবই ও শিক্ষক নির্দেশিকা কেনা সম্ভব হয়নি। পুরোনো বই, সংকুচিত পাঠ্যসূচি এবং স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করেই অনেক কেন্দ্রে পাঠদান চলছে। শিবিরের ২ হাজার ৫১টি লার্নিং ফ্যাসিলিটির মধ্যে ৬৫৪টি মেরামতের জন্য তালিকাভুক্ত হলেও বাজেটের অভাবে মাত্র ২০০টি মেরামত করা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জরাজীর্ণ ও অনিরাপদ অবস্থার কারণে ২৮৬টি কেন্দ্র পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।

শিক্ষার সুযোগে অগ্রগতি, তবু বড় ঘাটতি
সংকটের মধ্যেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিসেফ পরিচালিত এডুকেশন সেক্টরের আওতায় ৩ লাখ ২ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থী শিক্ষাকার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ জন মেয়ে। প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ শিশু কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে পড়াশোনা করছে। প্রথমবারের মতো ৪৭ জন শিক্ষার্থীর দ্বাদশ শ্রেণি শেষ করার সুযোগ তৈরি হওয়াও আশার খবর।

এ ছাড়া শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সহযোগিতায় ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এক হাজার ১০০-এর বেশি রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষককে পেশাগত প্রশিক্ষণের সনদ দিয়েছে। এই উদ্যোগ শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে পাঠদানের মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। শিক্ষা উপকরণ, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এসব অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হবে। বিশেষ করে শিবিরের মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাকেন্দ্র ও সমাজের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

সামাজিক বাধা পেরিয়ে রাজুমা-সালমাদের লড়াই
রোহিঙ্গা কিশোরীদের জন্য শিক্ষার পথ আরও কঠিন। পারিবারিক অনীহা, সামাজিক রক্ষণশীলতা, পথে হয়রানির আশঙ্কা এবং শিক্ষাকেন্দ্রের দূরত্বের কারণে অনেকেই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।

ক্যাম্প-১৭-এর কিশোরী রাজুমার অভিজ্ঞতা এ বাস্তবতার একটি উদাহরণ। ছেলে ও মেয়েদের একই শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর কারণে সামাজিক বাধার মুখে সে একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। পরে মেয়েদের জন্য পৃথক শিফট বা শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করা হলে আবার শিক্ষাকেন্দ্রে ফিরতে পারে। তার অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু শিক্ষাকেন্দ্র চালু করলেই হবে না; মেয়েদের সামাজিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

একটি শ্রেণিকক্ষে ১৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন মেয়ে। তাদের একজন ১৪ বছরের সালমা। মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে পড়ার সুযোগকে সে বড় অর্জন মনে করে। কিন্তু শিক্ষাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভয় কাটে না। তার প্রশ্ন, “যদি টাকা বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের স্কুলটাও কি বন্ধ হয়ে যাবে?”

সালমার কাছে শিক্ষাকেন্দ্র কেবল পড়াশোনার জায়গা নয়। সেখানে সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা করা, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ রয়েছে। ১২ বছরের মেহেরজানও অনিশ্চিত শিবিরজীবনকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দিতে চায় না। তার কাছে শিক্ষা আত্মমর্যাদা ও অধিকার অর্জনের পথ।

মেয়েদের পড়াশোনায় পরিবারের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নূর আলমের পরিবারেও দেখা যায়। ক্যাম্প-৪-এর এই ৬০ বছর বয়সী বাবা সামাজিক বাধা সত্ত্বেও মেয়ে নূর কৈদাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছেন। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয় এবং মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

কুতুপালংয়ের সামুদার গল্পও আশাব্যঞ্জক। বাবা সৈয়দ আলম আর্থিক অনটনের মধ্যেও পাঁচ সন্তানকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মেয়ে সামুদা ‘মাইয়া স্কুল’-এর মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে প্রচারেও যুক্ত হয়েছিল। পরে সে স্বামী ও মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করে। শিবিরের সামাজিক বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার এই অভিজ্ঞতা অন্য মেয়েদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে।

ইতিবাচক অভিভাবকত্বে বদলাচ্ছে পরিবার
রোহিঙ্গা পরিবারের আর্থিক অনটন ও মানসিক চাপের প্রভাব সরাসরি পড়ে শিশুদের ওপর। অনেক অভিভাবক নিজেদের দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে সন্তানদের বকাঝকা বা শারীরিক শাস্তি দেন। এই আচরণ শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় ইউনিসেফ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর ইতিবাচক অভিভাবকত্ব কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

চার সন্তানের বাবা হাবি মোহাম্মদ জানান, আগে পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ায় ছেলেকে বকাঝকা করতেন, এমনকি মারধরও করতেন। ২০২৫ সালে বাবাদের জন্য আয়োজিত অভিভাবকত্ববিষয়ক সেশনে অংশ নেওয়ার পর তাঁর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসে। তিনি বুঝতে পারেন, ভয় দেখিয়ে নয়, ধৈর্য ধরে কথা বলে ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে সন্তানকে বোঝানো প্রয়োজন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রায় ২৮ হাজার অভিভাবক, পরিচর্যাকারী এবং সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা ইতিবাচক অভিভাবকত্ব কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি মা ও নারী পরিচর্যাকারী, ১৩ হাজারের বেশি বাবা ও পুরুষ পরিচর্যাকারী এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০ সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা রয়েছেন। জার্মানির বিএমজেড ও কেএফডব্লিউয়ের অর্থায়নে ইউনিসেফ ও সহযোগী সংস্থাগুলো এই কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট এ ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।

মায়েদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ছে। প্রশিক্ষণ নেওয়া নূরবাহার শিশুদের টিকা, শিক্ষার গুরুত্ব, বাল্যবিয়ের ক্ষতি এবং নিরাপদ প্রসবের বিষয়ে অন্য অভিভাবকদের সচেতন করছেন। রোহিঙ্গা ধর্মীয় নেতা নূর হোসেনও জুমার বয়ানসহ বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে বাল্যবিয়ে নিরুৎসাহিত করা এবং মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। সামাজিক পরিবর্তনের এসব উদ্যোগ শিশুদের সুরক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।

শিক্ষার বাইরে শিশুরা বহুমুখী ঝুঁকিতে
শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া শিশুদের একটি অংশ শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, অপহরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের যৌথ সুরক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে শিবিরের ৩৩টি এলাকাতেই শিশুদের এসব ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১৬টি দলগত আলোচনায় অংশ নেওয়া ১৮১ শিশুর মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ জানিয়েছে, শিবিরে শিশুশ্রম একটি সাধারণ ঘটনা। পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো, দারিদ্র্য এবং শিক্ষার সুযোগের অভাব শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই আলোচনায় ৬৪ শতাংশ শিশু গভীর মানসিক ট্রমা ও অবহেলার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে।

শিশু অধিকার পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪৩৯টি গুরুতর অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে; এসব ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৬৪৫ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, পঙ্গু করা, অপহরণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীতে জোরপূর্বক নিয়োগ এবং হাসপাতালে হামলার মতো ঘটনা রয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিশুসুরক্ষা কার্যক্রমের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা শাহী নেওয়াজ বলেন, শিবিরে শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, যৌন নির্যাতন, অপহরণ এবং অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঘটনা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের সমাজকর্মী, কমিউনিটি-ভিত্তিক শিশুসুরক্ষা কমিটি ও উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে।

তবে বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বিদ্যমান জনবল ও সম্পদ সীমিত। শাহী নেওয়াজের ভাষ্য অনুযায়ী, শিবিরগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। ফলে প্রতিটি শিশুর ঝুঁকি শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

মানসিক ট্রমা ও জলবায়ুজনিত বিপদ
রোহিঙ্গা শিশুদের সংকট শুধু দৃশ্যমান শারীরিক সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, সহিংসতার স্মৃতি, পারিবারিক বিচ্ছেদ, অপহরণের ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫–২৬ সালের জনস্বাস্থ্য মূল্যায়নের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ২১ দশমিক ৬ শতাংশ তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন। মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশের।

ইউনিসেফের ২০২৬ সালের মধ্যবর্ষের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার ও ভাসানচরে ৮৩ হাজারের বেশি শিশু ও অভিভাবক মনোসামাজিক সহায়তা পেয়েছেন। এ ছাড়া ৫ হাজার ৩০০ শিশুকে শিশুসুরক্ষা কেস ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনা হয়েছে এবং ১৭ হাজার ১০০ নারী ও শিশু জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধমূলক সুরক্ষা পেয়েছেন। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা জোরদার করতে ১৭৭ নারী ও ২৪ পুরুষ শিক্ষককেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের কাউন্সিলর উপমা দাস বলেন, সামাজিক কুসংস্কার, বয়ঃসন্ধিকালীন ভয়, নির্যাতন, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে। বিশেষ করে বাল্যবিয়ে ও ধর্ষণের শিকার শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শিশুর কথা শোনা, তাকে নিরাপদ বোধ করানো এবং অভিভাবকদের সচেতন করা মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। পাহাড় কেটে তৈরি ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৭ জুলাই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে শিবিরে নয়জনের মৃত্যু হয়; পরদিন ক্যাম্প-৫-এ পাহাড়ধসে চার কিশোরীর মৃত্যু হয়। অতিরিক্ত ঘনবসতি, অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থের ঘাটতি এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও টেকসই সমাধানের প্রয়োজন
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশ্লেষক আসিফ মুনীর মনে করেন, রোহিঙ্গা শিশুদের সংকট মোকাবিলায় পুষ্টি, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অর্থসহায়তা কমে যাওয়ায় শিশুরা অপুষ্টি ও শিক্ষাবঞ্চনার ঝুঁকিতে পড়ছে। শিক্ষার বাইরে থাকা দেড় লাখের বেশি শিশুকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও নিরাপত্তার পাশাপাশি ভালোবাসা, যত্ন, শিক্ষা, সুস্থ বিনোদন এবং নিজের কথা প্রকাশের স্বাধীনতাও প্রয়োজন। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

তহবিল সংকটের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার ও ভাসানচরে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন ও শিশুসুরক্ষা কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ইউনিসেফকে ১ কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৫ সালে প্রয়োজনীয় তহবিলের ৪৬ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালেও অর্থের ঘাটতি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জরুরি মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুসুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা। মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে পরিবার ও সমাজের সমর্থনও অপরিহার্য। তবে এসব উদ্যোগের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করবে শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা তৈরির ওপর।

রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র কেবল পাঠদানের জায়গা নয়; এটি তাদের নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্র। অর্থের অভাবে এই দরজা বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতি হবে একটি প্রজন্মের। আর রাজুমা, সালমা, মেহেরজান ও সামুদাদের অভিজ্ঞতা দেখায়—সুযোগ, নিরাপত্তা ও সমর্থন পেলে প্রতিকূলতার মধ্যেও শিশুরা সামনে এগোতে পারে।

১

সর্বকালের সেরা বিতর্কে মেসির ওপরে পেলেকে রাখলেন রোমারিও

২

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক তিন জাতীয় কমিটি বাতিলের দাবি

৩

ড্রয়ে হতাশ শান্ত, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে চান

৪

পরাজয়ের কিনারায় অবিশ্বাস্য প্রতিরোধের গল্প

৫

আইনি লড়াই কি পাখতুনখোয়ার ক্ষমতায় ফেরাবে পিটিআইকে

৬

বিক্ষোভে ভিন্ন আচরণ করে বিরোধীদের বিভক্ত করছে সরকার: সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা

৭

আফগানিস্তানে বিবিসির এফএম সম্প্রচার বন্ধ করল তালেবান

৮

মিষ্টির শূন্য আসনে ভোট দিতে পারবে না জামায়াত জোট

৯

সৌদির বিমানবন্দরে অচলাবস্থা, ঢাকার ৮২ ফ্লাইট ব্যাহত

১০

লালমনিরহাটে প্রশাসনের নির্দেশে প্রধান শিক্ষকের যোগদান ঘিরে সংঘর্ষ, আহত ১৩

১১

সাতক্ষীরায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, থানায় মামলা

১২

মাদরাসাছাত্রীদের উত্ত্যক্তের অভিযোগে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১২

১৩

সরকারি স্কুলে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা, প্রথম শ্রেণিতে লটারি

১৪

বিরোধী দলকে নিয়েই সংবিধান সংশোধন চাই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৫

এনসিপিতে ‘সুপার ইলেভেন’ থেকে ‘সুপার সিক্স’, শীর্ষ পদে আসছেন চার নেতা

১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

২

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

৩

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

৪

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

৫

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

৬

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

৭

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

৮

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

৯

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত