জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন নিজ নিজ পদে বহাল থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে আসছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। দলের শীর্ষ পর্যায়ের ১১টি পদ নিয়ে গঠিত ‘সুপার ইলেভেন’ কাঠামো বদলে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা দলের ভেতরে ‘সুপার সিক্স’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
দলীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও দায়িত্ব বণ্টন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এসব পদায়নকে চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না।
কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, দলের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হবে। নতুন পদ ও দায়িত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা রয়েছে।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনও সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এনসিপি প্রথমে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। পরে বিভিন্ন সময়ে নতুন নেতারা দলে যুক্ত হওয়ায় তাঁদের দায়িত্ব দিতে একাধিক পদ সৃষ্টি করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে গড়ে ওঠা কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসে নেতাদের সাংগঠনিক তৎপরতা, কাজের দক্ষতা ও পারফরম্যান্স বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। দল গঠনের পর থেকে জাতীয় নির্বাচন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে চার নেতার ভূমিকা বিবেচনায় তাঁদের আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলীয় নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন বা বিস্তারিত মানদণ্ড প্রকাশ করা হয়নি।
এনসিপির বর্তমান কাঠামোয় আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের পাশাপাশি মুখ্য সমন্বয়ক, দুই অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবসহ একাধিক শীর্ষ পদ রয়েছে। পুনর্গঠনের মাধ্যমে এসব দায়িত্বের কিছু বিলুপ্ত বা পুনর্বিন্যাস করে নেতৃত্বের কাঠামো ছোট করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়িত্ব বণ্টন আরও কেন্দ্রীভূত হতে পারে—যদিও এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় রাজনৈতিক পর্ষদের অন্য ১০ সদস্যকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও দলীয় সূত্রে এসেছে। তবে নতুন কমিটিতে কার কী দায়িত্ব থাকবে, দায়িত্বগুলোর পরিধি কী হবে এবং আগের পদগুলো কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণার পরই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক ও আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা দলটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ এবং ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক বিস্তারেও কাজ করছে।
দলীয় এক নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় কমিটি গঠনের পর উপজেলা পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাঠামো পুনর্বিন্যাসকে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গোছানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এবার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের বক্তব্য। তবে পুনর্গঠনের মাধ্যমে দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, মাঠপর্যায়ের সংগঠনের সঙ্গে কেন্দ্রের সমন্বয় কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্ষদের কার্যকারিতায় কী পরিবর্তন আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন কমিটি ঘোষিত হলে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বে কারা কোন দায়িত্বে থাকছেন, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে। আপাতত নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের বর্তমান পদে থাকার কথা এবং চার নেতার নতুন দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাই পুনর্গঠনের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে।