শরীরে ৬৪টি সেলাইয়ের ক্ষতচিহ্ন। এক যুগ আগে সংবাদপত্রের পাতায় যার নাম উঠেছিল ‘মৃতের তালিকায়’, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেই লড়াকু তরুণকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে একমুঠো ভাতের জন্য। যে সংগঠনের জন্য রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে, চরম দুর্দিনে সেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও মেলেনি সহায়তা। দলের আমিরের কাছে খোলা চিঠি লিখেও মেলেনি কোনো চাকরি।
অবশেষে রাজনৈতিক পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে সেই অসহায় সাবেক শিবির নেতার পাশে দাঁড়ালেন ভিন্ন দলের নেতা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সম্মানজনক চাকরি দিয়ে তিনি ফিরিয়ে দিলেন এক সংগ্রামী তরুণের বাঁচার আশা।
১৩ বছর আগে রক্তক্ষয়ী হামলায় পঙ্গুত্ব বরণ করা তৎকালীন শিবির নেতা সাব্বির প্রামাণিক এখন একটি চালকল, কংক্রিট ইটভাটা ও মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার)। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও তীব্র অর্থকষ্ট পেরিয়ে তার পরিবারে এখন ফিরেছে এক চিলতে স্বস্তি।
সাব্বিরের জীবনসংগ্রামের সূচনা ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ চত্বরে রাজনৈতিক সহিংসতায় বর্বরোচিত হামলার শিকার হন তিনি। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তার সহযোদ্ধা আবু রুহানী। সাব্বিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। ফুসফুস, কিডনি ও হৃৎপিণ্ডের জটিল অস্ত্রোপচার শেষে তার নিথর শরীরে পড়েছিল ৬৪টি সেলাই। তৎকালীন গণমাধ্যমে তাকে মৃত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি।
দলের অবহেলা ও খোলা চিঠির কান্না
বেঁচে ফিরলেও ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়নি সাব্বিরের। পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে একপর্যায়ে অটোরিকশার হ্যান্ডেল চেপে ধরেন, কিন্তু অসুস্থ শরীর সায় দেয়নি। একদিকে চিকিৎসার চড়া ব্যয়, অন্যদিকে অনাহার চরম সংকটে পড়ে একসময়ের রাজপথ কাঁপানো এই ছাত্রনেতা দ্বারস্থ হন নিজ দলের নেতাদের।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের উদ্দেশে খোলা চিঠিও লেখেন। তবে সাব্বিরের অভিযোগ, আশ্বাস মিললেও শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হতে হয়েছে তাকে; জোটেনি কোনো কর্মসংস্থান।
আক্ষেপ প্রকাশ করে সাব্বির বলেন, যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলাম, সেই জামায়াতের নেতাদের কাছে বহুবার গিয়েছি। তারা শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঘুরিয়েছে, দুর্দিনে পাশে দাঁড়ায়নি। অথচ ভিন্ন দলের হয়েও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ভাই আমার আকুতি শুনেছেন। তিনি আমাকে সম্মানজনক চাকরি দিয়েছেন, ভালো বেতন দিচ্ছেন। আল্লাহ এখন আমাদের পরিবারকে শান্তিতে রেখেছেন।
সংবাদ দেখে পাশে দাঁড়ালেন প্রতিমন্ত্রী
সম্প্রতি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাব্বিরের এই মর্মান্তিক জীবনসংগ্রামের খবর ছড়িয়ে পড়লে তা নজরে আসে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সাব্বিরের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নেন। বর্তমানে সাব্বির তার পুষ্টি চালের মিল, সিমেন্টের ইট তৈরির কারখানা এবং মাছের খামার তদারকি ও হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের সাবেক এক কর্মীর পাশে এভাবে দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশংসিত হচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী। অতীতের হিসাব-নিকাশ আর রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে একজন মানবিক নেতার এমন হস্তক্ষেপে দীর্ঘ ১৩ বছর পর স্বাভাবিক জীবনের নতুন স্বপ্ন দেখছেন সাব্বির ও তার পরিবার।