বেসরকারি স্কুল ও কলেজের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশোধিত নীতিমালায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির শর্ত, সহকারী লাইব্রেরিয়ান ও গ্রন্থাগারিকদের পদোন্নতি, ডিগ্রি কলেজের তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি, শিক্ষক নিয়োগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ গ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি বিষয় ও তৃতীয় ভাষা চালু।
তবে এসব পরিবর্তন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশোধিত খসড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর সভায় আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, নীতিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। খসড়া প্রস্তুত হলে তা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।
সংশোধনের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সহকারী শিক্ষক বা প্রভাষক (গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান) পদে কর্মরতদের পদোন্নতির সুযোগ। তাঁদের পদবির নাম পরিবর্তনের দাবি থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে ইতিবাচক নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে পদবির নাম অপরিবর্তিত রেখেই চাকরির বিধি ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পদোন্নতি এবং পদোন্নতিজনিত বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে।
ডিগ্রি কলেজের তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জটিলতা নিরসনও সংশোধনের অন্যতম লক্ষ্য। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনজন শিক্ষক থাকার শর্ত থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় দুজন শিক্ষকের কথা উল্লেখ ছিল। এ অবস্থায় বিভিন্ন কলেজে তৃতীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁদের এমপিওভুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
সংশোধিত নীতিমালায় এসব শিক্ষকের এমপিওভুক্তির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির এক কর্মকর্তা বলেন, ডিগ্রি তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বিষয়ে খসড়ায় প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের এমপিওভুক্ত করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিতে আরেকটি পরিবর্তন আসতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালের নীতিমালায় কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অথবা অধিভুক্ত কলেজ’ উল্লেখ থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিতে জটিলতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ সমস্যা দূর করতে সংশোধিত নীতিমালায় ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়/পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির শর্তেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন স্কুল ও কলেজের এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে অন্তত দুটি কারিগরি বিষয় চালু রাখার শর্ত যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় একটি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এসব শর্ত পূরণ না করলে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সুযোগ পাবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমান এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য বৈধ স্বীকৃতি ও নিয়মিত নবায়ন থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও উপযুক্ত জমি, স্তরভেদে নির্ধারিতসংখ্যক শিক্ষার্থী, বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং সন্তোষজনক পাসের হার থাকতে হয়। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ সরকার নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী হতে হয় এবং শিক্ষক নিয়োগে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সুপারিশসহ নির্ধারিত জনবল কাঠামো অনুসরণ করতে হয়।
সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, নীতিমালার বিভিন্ন অসংগতি ও বাস্তবায়নজনিত জটিলতা দূর করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সংশোধিত খসড়া শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে আলোচনা ও পর্যালোচনার পরই পরিবর্তনগুলো চূড়ান্ত হবে।
ট্যাব পাচ্ছেন প্রাথমিকের ৩ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষক
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদি পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৫) আওতায় দেশের ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন শিক্ষককে একটি করে ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও থাকছে। ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ কর্মসূচির অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ থাকায় দুই সপ্তাহের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন। পিইডিপি-৫-এর আওতায় তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিতে এ কার্যক্রমের নাম রাখা হয়েছে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় কর্মসূচিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, কর্মসূচির মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দেওয়া হবে। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে সংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিদ্যালয় স্থাপন, পুরোনো বিদ্যালয় সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপন, শিক্ষার্থীদের জুতা, স্কুল ড্রেস ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণও এর অংশ।
তবে কর্মসূচির কয়েকটি খাতের ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি রয়েছে। বিশেষ করে ৪৩৬ কোটি টাকার পরামর্শক প্যাকেজসহ কয়েকটি অঙ্গের বরাদ্দ যৌক্তিকীকরণের পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যেসব পদ বা কার্যক্রমের ব্যয় প্রকল্পের পরিবর্তে রাজস্ব খাত থেকে বহন করা প্রয়োজন, সেগুলো আগামী দুই বছরের মধ্যে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, কর্মসূচিটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পর বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর ভিত্তিতে সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেওয়া হলেও দ্বিতীয় দফা পর্যালোচনায় আরও কিছু বিষয়ে আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংশোধিত ডিপিপি জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরবর্তী কার্যক্রম ও প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) নিয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় পিইডিপি-৫ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে হবে।
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৯ জন। চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় এর মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষককে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পঞ্চম কর্মসূচি শুরু হলে অবশিষ্ট শিক্ষকদেরও ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
পিইডিপি-৫-এর মাধ্যমে একদিকে শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়ানো, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও পাঠদানের পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে ট্যাব বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন, প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিকীকরণ এবং রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়, তার ওপর কর্মসূচির সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।