ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তাঁকে ঘিরে আলোচনা ও বিতর্কের শেষ হয়নি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ বাসায় সালমান শাহর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি সে সময় আত্মহত্যা হিসেবে আলোচিত হলেও পরে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সময় নানা বক্তব্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৭ সালে সংবাদমাধ্যম রাইজিংবিডিকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সামিরা হক মৃত্যুর আগের রাত ও পরদিন সকালের ঘটনাগুলো নিজের ভাষ্যে তুলে ধরেছিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মৃত্যুর আগের রাতে সালমান শাহ, যাঁকে পরিবারের সদস্যরা ইমন নামেও ডাকতেন, তাঁর সঙ্গে তাঁর অভিমান চলছিল।
সামিরার ভাষ্য অনুযায়ী, শাবনূরকে নিয়ে দাম্পত্য জীবনে তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি মায়ের বাসায় চলে যান। পরে সালমান তাঁকে ফিরিয়ে আনেন এবং শাবনূরের সঙ্গে আর সিনেমা না করার প্রতিশ্রুতি দেন। সামিরা জানান, ‘প্রেম পিয়াসী’ সিনেমার ডাবিংয়ে গিয়েও তিনি সালমানের সঙ্গে ছিলেন। সেখানে শাবনূরের আচরণ নিয়ে তাঁর খারাপ লাগে এবং তিনি শ্বশুরকে বিষয়টি জানান।
সামিরা বলেন, ৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি রাগ করে ডাবিং থেকে বের হয়ে আসেন। সালমানও তাঁকে অনুসরণ করে গাড়িতে ওঠেন। তাঁদের সঙ্গে পরিচালক বাদল খন্দকারও ছিলেন। পরে তাঁরা বাসায় যান। সেখানে রাতের খাবার খাওয়ার সময় সালমান স্ত্রীকে মানানোর চেষ্টা করেন বলে জানান সামিরা।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বাদল খন্দকারও তাঁকে বিষয়টি আর না বাড়াতে অনুরোধ করেন। সামিরার দাবি, ওই সময় সালমান শাবনূরের সঙ্গে আর সিনেমা করবেন না বলে কিছু চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলেন। বাদল খন্দকার চলে যাওয়ার পর তাঁরা দুজন ঘরে যান।
এরপর একটি ফোনকলকে কেন্দ্র করে আবার তাঁদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানান সামিরা। তাঁর ভাষ্য, সালমান একটি ফোনকল প্রথমে কেটে দেন। পরে আবার ফোন এলে তিনি সেটি নিয়ে বাথরুমে চলে যান। ফোনের অপর প্রান্তে একজন নারীর কণ্ঠ শুনতে পান বলে দাবি করেন সামিরা। এতে তিনি আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সামিরা জানান, তিনি নিচে নেমে ট্যাক্সি নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে সালমান ওপর থেকে চিৎকার করে তাঁকে বাসায় ফিরিয়ে আনেন। পরে দুজনের মধ্যে দীর্ঘ সময় কথা ও কান্নাকাটি হয়। সামিরার ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান তাঁকে বলেন, তিনি ভুল করেছেন এবং আর এমন হবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কিছু সিনেমা করে অর্থ সঞ্চয় করে তাঁরা কানাডায় চলে যাবেন বলেও সালমান তাঁকে জানিয়েছিলেন।
সামিরা বলেন, সেদিন রাত আড়াইটার পরও দুজনের ঘুম আসেনি। পরে সালমান একটি ক্যাসেট চালিয়ে তাঁর পছন্দের গান শোনান। একপর্যায়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। সালমান কখন ঘুমিয়েছিলেন, তা তিনি জানেন না।
পরদিন সকালে সালমানের বাবা তাঁদের বাসায় আসেন বলে জানান সামিরা। তিনি কিছু টাকা চান এবং সালমানকে না জাগাতে বলেন। সামিরা টাকা আনতে গিয়ে দেখেন সালমান ঘুমিয়ে আছেন। পরে তিনি আবার তাঁর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়েন।
সামিরার ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ১১টার দিকে সালমান ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যান। তাঁদের চোখাচোখিও হয়। এরপর তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর গৃহকর্মী ডলি এসে জানান, সালমানের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তখন সামিরা ও অন্যরা দরজা খোলার চেষ্টা করেন। অতিরিক্ত চাবি এনে দরজা খোলা হলে সালমানকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে জানান তিনি।
সামিরা দাবি করেন, তাঁরা দ্রুত তাঁকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তাঁর ধারণা ছিল, সালমান তখনো বেঁচে থাকতে পারেন। পরে তাঁকে নিচে নামানো হয়।
সাক্ষাৎকারে সালমানের মৃত্যুর কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সামিরা। তিনি বলেন, তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে মৃত্যুর পদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা শুনেছেন। কখনো ফ্যানের তার, কখনো ফোনের কর্ড কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে—এমন দাবি করে তিনি প্রকৃতপক্ষে কীভাবে সালমানের মৃত্যু হয়েছিল, তা জানতে চেয়েছিলেন।
সালমান শাহ ও সামিরা হক ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট বিয়ে করেন। মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্রজীবনে সালমান ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিজীবন এবং মৃত্যুরহস্য নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
তবে ২০১৭ সালের ওই সাক্ষাৎকারে সামিরা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তাঁর নিজস্ব বর্ণনা। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নানা বক্তব্য ও দাবি সামনে এসেছে। ফলে সাক্ষাৎকারের বক্তব্যকে চূড়ান্তভাবে মৃত্যুর কারণ বা ঘটনার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে সে সময়ের একটি প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত বর্ণনা হিসেবে দেখা উচিত।