রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মূল সড়কঘেঁষা প্রায় ১১ একর জমি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিজস্ব এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। অথচ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জমিটি কার্যত বেদখলে। সেখানে গড়ে উঠেছে মাছ ও মুরগির আড়ত, বাঁশের ব্যবসা, কাঁচাবাজারসহ নানা স্থাপনা। জমির একটি অংশ ঘিরে গড়ে উঠেছে বস্তিও।
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৬২ সালে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজার এই জমি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন হয়ে হয় রাজউক। কিন্তু দীর্ঘ ২১ বছর ধরে জমিটি দখলমুক্ত করতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জমি নিয়ে একে একে পাঁচটি রিট মামলা হলেও এত বছরেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জমি উদ্ধারের তৎপরতা বারবার থেমে গেছে। দখলদারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় এবং তার একটি অংশ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নথি ঘেঁটে জানা যায়, ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারায় ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়। এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশের পর ওই বছরের ২৫ এপ্রিল জমির দখল ডিআইটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিআইটির অনুকূলে দেওয়া হয় ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ও।
এর বহু বছর পর জমিটি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি জমিটি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। একই বছর রাজউকের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ-দৌলার নেতৃত্বে জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আরেকটি রিট করেন। পরে ২০০৭ সালে মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও রিট করে। এভাবে ধাপে ধাপে জমিটি ঘিরে পাঁচটি রিট মামলা হয়।
তবে মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জমিতে বছরের পর বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলতে থাকার অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রামপুরা ব্রিজ থেকে কিছুটা দূরে মূল সড়কের পাশে বাঁশের আড়ত। এর পরেই মেরুল কাঁচাবাজার। একটি টিনের ঘরে রয়েছে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’-এর কার্যালয়। পাশেই গড়ে উঠেছে বড় একটি বস্তি। জমিটির কাছেই রয়েছে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ।
জমিটি রাজউকের বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও সেখানে ব্যক্তিমালিকানার দাবিতে সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯ এবং সিটি-১৫০০৯ দাগ নম্বর উল্লেখ করে মোট ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির দাবি করা হয়েছে।
জমি উদ্ধারে রাজউকের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
জমি দখলের পাশাপাশি এটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’কে কেন্দ্র করে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, স্বল্পমূল্যে দোকান বরাদ্দের আশ্বাস দিয়ে বছরের পর বছর সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা, কিস্তি ও বিভিন্ন খরচের নামে টাকা নেওয়া হয়েছে।
সমিতির একটি সাইনবোর্ডে রাজউকের জমির ১ একর ৮৯ শতাংশ নিজেদের বরাদ্দপ্রাপ্ত জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা সমিতিটিতে ধাপে ধাপে প্রায় ছয় হাজার সদস্য যুক্ত হন। স্থায়ী একটি দোকান পাওয়ার আশায় অনেকে নিজেদের সঞ্চয় সমিতিতে জমা দেন।
২০১০ সালের ৮ মার্চ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির ও অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে মামলা পরিচালনা ও অন্যান্য খরচ বাবদ সদস্যদের কাছ থেকে এককালীন এক হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়। মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া সদস্যদের সদস্যপদ উত্তরাধিকারী কিংবা অন্যের নামে হস্তান্তরের সুযোগের কথাও জানানো হয়। এ ক্ষেত্রেও দুই হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ ধরনের বিভিন্ন নোটিশের মাধ্যমে বছরের পর বছর সদস্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। রসিদ ও বিভিন্ন অজুহাতে দফায় দফায় টাকা সংগ্রহ করা হলেও অধিকাংশ সদস্য শেষ পর্যন্ত দোকান পাননি। তাদের দাবি, এভাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও।’
আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, ‘একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে আমার জমানো টাকার হদিস নেই।’
সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ‘১৯৮৮ সালে যাত্রা হওয়া এই সমিতিতে সদস্যরা টানা ৩০ বছর ধরে চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও “শংকর” নামের এক পক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে।’
২০০৫ সালের উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সমিতির কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। ওই সময় সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলে টাকা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে সমিতির কার্যালয় মেরুল বাড্ডা থেকে মতিঝিলে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাজউকের সঙ্গে আইনি জটিলতা কেটে যাবে—এমন আশ্বাস দিয়ে সেখান থেকেও সদস্যদের কাছ থেকে কিস্তি ও বিভিন্ন খাতে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজউকের প্রায় ১১ একর জমি দুই দশকের বেশি সময় ধরে দখলমুক্ত না হওয়া এবং একই জমিকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। জমির মালিকানা, রিট মামলার বর্তমান অবস্থা, কথিত দোকান বরাদ্দ এবং সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ—সবকিছুর স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, জমির প্রকৃত মালিকানা ও আইনি অবস্থান দ্রুত নির্ধারণ করে রাজউকের জমি উদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে সমিতির নামে সংগৃহীত অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, অভিযোগের তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের আরও দাবি, টাকা নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য ও তাঁদের উত্তরসূরিদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।