বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেখানে জমি কেনাবেচার প্রক্রিয়া কী এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা পরিচালনায় কোন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা রয়েছে—এসব বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এলাকাটিতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জমি কেনাবেচা ও ক্যাবল টেলিভিশনের সংযোগসহ বিভিন্ন সেবা নিয়ে কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন ওঠে। এ সময় এলাকাটির কার্যক্রমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়। বৃহস্পতিবার সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে রাজউকের আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, কমিটির একাধিক সদস্য বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের একজনের অভিযোগ, ওই এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বসুন্ধরা গ্রুপের নিয়োগ করা কর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করেন। জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও গ্রুপটিকে কমিশন দিতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এমনকি ক্যাবল টেলিভিশনের সংযোগ নিতে হলেও ওই গ্রুপের কাছে যেতে হয় বলে বৈঠকে দাবি করা হয়।
এক সদস্য এসব কার্যক্রমের ধরনকে ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটি রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আরেক সদস্য জানতে চান, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কার্যত কার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং সেখানে জমি কেনাবেচার অনুমতি কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়।
জবাবে রাজউকের কর্মকর্তারা জানান, কাগজে-কলমে এলাকাটি সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারভুক্ত। তবে সিটি করপোরেশন সেখানে এখনো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বলে বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্যবস্থাপনা ও জমি কেনাবেচা নিয়ে কমিটির সদস্যদের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও, এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে রাজধানীর আবাসন, নগর ব্যবস্থাপনা, রাজউকের প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে।
পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্লট বরাদ্দ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে প্লট বরাদ্দে অতীতের অনিয়ম এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নতুন ভূমিনির্ভর আবাসন প্রকল্পের পরিবর্তে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। রাজধানীতে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ এবং আবাসিক এলাকায় অনুমোদনবহির্ভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।
রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের মাধ্যমে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয় রাজউককে।
পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণের জন্য সমন্বিত ইউটিলিটি ব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ ক্যাবল স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। নতুন বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শৌচাগার ও নামাজের স্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঢাকার লেক সংরক্ষণ এবং শহরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশও করা হয়েছে।
বৈঠকে নিরীক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা। আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত নিরীক্ষা সম্পন্ন এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, হুইপ মো. আকতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কায়সার আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন অংশ নেন।
এ সময় হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, রাজউক চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিএজি), গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।