কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে ৬০টি অনুমোদিত শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৮ জন। ৩২ পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম
কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে তীব্র শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর একাডেমিক কার্যক্রম। কলেজটিতে অনুমোদিত ৬০টি শিক্ষকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৮ জন। ফলে ৩২টি পদই শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ও ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটিতে গত ৮ জুন স্থায়ী অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন ২২তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক মো. জহুরুল হক। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কলেজের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, শিক্ষা পরিবেশ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন স্থায়ী অধ্যক্ষ না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর কলেজের ৩৩টি ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি হিসাবে অর্থ পাওয়া গেলেও কয়েকটি হিসাবে কোনো অর্থ ছিল না। এমনকি একটি চলতি হিসাবে জমা ছিল মাত্র ৩০০ টাকা।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বকেয়া বেতন পরিশোধকেও অগ্রাধিকার দেন অধ্যক্ষ। অতিথি শিক্ষক ও মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় ১২ জন নতুন অতিথি শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনজন অতিথি শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
কলেজের প্রভাষক সাহেব আলী বলেন, “অনুমোদিত ৬০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৮ জন। শূন্য রয়েছে ৩২টি পদ। গ্রন্থাগারিক, শরীরচর্চা শিক্ষক ও প্রদর্শক পদেও জনবল সংকট রয়েছে। ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।”
শিক্ষক সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগে। প্রভাষক তপতি রানী বলেন, “শিক্ষক ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগের ওপর। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ও ব্যবহারিক ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারিক কক্ষ অব্যবহৃত থাকায় আসন থাকা সত্ত্বেও ভর্তি কমে যাচ্ছে, যা ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।”
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শিক্ষক সংকট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিরাতুন বিনতে বুশরা বলেন, “বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষক সংকটের কারণে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু এখানেও ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত।”
শুধু শিক্ষক সংকট নয়, নতুন অধ্যক্ষের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। প্রভাষক মিনারা বেগম জানান, প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষাগত অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করছেন।
প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। প্রভাষক সংগীতা রানী বলেন, “কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরেছে। রেজিস্টার, ক্যাশবই ও চেকবইসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।”
অবকাঠামোগত উন্নয়নেও কিছু কাজ শুরু হয়েছে। প্রভাষক ফাতেমা বেগম জানান, নতুন অধ্যক্ষের উদ্যোগে শ্রেণিকক্ষে নতুন ফ্যান স্থাপন, সিসিটিভি ক্যামেরা সংযোজন, ল্যাব সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর এবং ছাত্রীদের বাথরুম মেরামতসহ বিভিন্ন কাজ শুরু হয়েছে।
বকেয়া বেতন পরিশোধ হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অতিথি শিক্ষক ও কর্মচারীরাও। অতিথি শিক্ষক চৌধুরী রিংকু র্যাবেন বলেন, “অধ্যক্ষ স্যার যোগদানের সময় আমাদের এবং মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বকেয়া ছিল। এখন তা সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়েছে।”
সহকারী অধ্যাপক সাজেদুর রহমান মণ্ডল বলেন, “দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে সবার মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরেছে এবং সবাই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন।”
কর্মচারী নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, “এখন আর কলেজ ফাঁকি দেওয়া যায় না। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। মনে হয়, প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হাবিবুল্লাহ স্যার মারা যাননি, তিনি আবার কলেজে ফিরে এসেছেন।”
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মীর মুহ. হাবিবুল্লাহর হাত ধরে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারি হলেও স্থায়ী অধ্যক্ষের অভাবে বিভিন্ন সমস্যা অব্যাহত ছিল।
বর্তমানে কলেজটিতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পাশাপাশি স্নাতক এবং ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ২৮ জন শিক্ষক কর্মরত থাকায় নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. জহুরুল হক বলেন, “কলেজে নানা সমস্যা রয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিথি শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় সুশীল সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও কলেজটির মূল সংকট এখনো শিক্ষকস্বল্পতা। ৬০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৩২টি পদ শূন্য থাকায় দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ না হলে শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।