কুমিল্লার লালমাইয়ে কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কসংলগ্ন একটি ধানক্ষেত থেকে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি ক্ষেতে ধানের চারা মাড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। মৃত্যুর আগে কিশোরী তার বাবাকে মেসেজের পাশাপাশি লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল। তবে বাবা বার্তাটি দেখার আগেই মেয়েটির মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার ভোরে লালমাই উপজেলার জগৎপুরের মাইনি মুড়া জঙ্গল এলাকার ধানক্ষেত থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত কিশোরী কুমিল্লা শহরের একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার পরিবারের গ্রামের বাড়ি যশোরে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত সে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মরদেহ উদ্ধারের জায়গার আশপাশের চার-পাঁচটি ধানক্ষেতের উঠতি চারা মাড়ানো। দেখে মনে হয়, ক্ষেতের ওপর দিয়ে কেউ ছোটাছুটি করেছে। তবে এসব চারা কীভাবে মাড়ানো হয়েছে, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, হামলার শিকার হয়ে কিশোরী প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাস্থলে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সকালে ধানক্ষেতের অবস্থা দেখে তাঁদের মনে হয়েছিল সেখানে ধস্তাধস্তি হয়েছে। পরে কাছে গিয়ে দেখেন, কিশোরীর মাথা ও শরীর কাদার নিচে ছিল; শুধু পিঠের অংশ দেখা যাচ্ছিল। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা নিষেধ করায় তাঁরা মরদেহের কাছে যাননি। কাছেই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে ছিল।
একই এলাকার বাসিন্দা মো. হাসান জানান, ভোরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি রাস্তার পাশে অটোরিকশাটি উল্টে থাকতে দেখেন। কয়েকজন মিলে সেটি তোলার পর প্রায় এক ঘণ্টা পরে পাশের ধানক্ষেতে একটি মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
হাসানের ভাষ্য, কিশোরীর গলায় দড়ির মতো কিছু প্যাঁচানো ছিল এবং মরদেহটি উপুড় অবস্থায় পড়ে ছিল।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে জানান, প্রথমে মরদেহের পরিচয় জানা যায়নি। পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। কিশোরীর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
**বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন**
নিহত কিশোরীর বাবা জানান, রোববার মেয়েটি কুমিল্লা শহরে এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানিয়েছিল।
বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ে তাঁকে মেসেজের সঙ্গে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে সেখান থেকে নিয়ে যেতে বলে। কিন্তু তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পাননি। ভোরে মেসেজ খুলে লোকেশন দেখার পর সেখানে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেখতে পান বলে জানান তিনি।
তবে পুলিশের তদন্তে কিশোরীর চলাফেরা সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লা ফেরদৌস জানান, পরিবারের কাছে কিশোরী শহরে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বললেও তদন্তে জানা গেছে, সে ওই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার ভোররাতে কক্সবাজার যায়।
পুলিশ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে কিশোরী। এরপর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
**সিসিটিভিতে শেষ দেখা নূরজাহান হোটেলের সামনে**
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনের সিসিটিভি ফুটেজে বুধবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে একটি বাস থেকে কিশোরীকে নামতে দেখা যায়। তখন তার পরনে গোলাপি রঙের জামা ছিল এবং কাঁধে একটি ব্যাগ ঝোলানো ছিল।
বাস থেকে নেমে তাকে হোটেলের পশ্চিম পাশের স্টেশনারি দোকানগুলোর দিকে যেতে দেখা যায়। একটি দোকানে গিয়ে হাতে থাকা কোনো জিনিস দোকানিকে দেখিয়ে কিছু জানতে চায় সে। পরে দোকানিকে অন্যদিকে নির্দেশ করতে দেখা যায়। এরপর কিশোরী সেখান থেকে সরে অন্য পাশে চলে যায়।
আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে আনুমানিক সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। এরপর তার চলাচলের বিষয়ে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লা ফেরদৌস বলেন, মরদেহের কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কিশোরী নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে অটোরিকশা ভাড়া করে কোথাও যাচ্ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ ও অটোরিকশাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
ময়নাতদন্ত শেষে কিশোরীর মরদেহ দাফনের জন্য বৃহস্পতিবার রাতে যশোরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কিশোরী কীভাবে ওই ধানক্ষেতে পৌঁছাল, তার সঙ্গে থাকা অটোরিকশাটির চালক কে এবং মৃত্যুর আগে কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও পুলিশের তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।