শরীয়তপুরের জাজিরায় মা ইলিশ রক্ষায় পদ্মা নদীতে অভিযান চালানোর সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ৪১ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে প্রায় দুই লাখ মিটার ইলিশ ধরার জাল জব্দ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সোমবার ভোরে উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের পদ্মা নদীর কলিকাল চরে এ ঘটনা ঘটে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন শরীয়তপুর-১ (সদর ও জাজিরা) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ আসলাম। ঘটনার সময় তিনি মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিছুটা দূরে একটি স্পিডবোটে অবস্থান করছিলেন।
শরীয়তপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, মা ইলিশ রক্ষায় অভিযানে গেলে জেলেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সদস্যদের ওপর হামলা চালান। এ সময় ৪১ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে রয়েছেন। তাঁরা ফিরে এলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে।
অভিযানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে জানা যায়, সোমবার ভোরে জাজিরার বিলাসপুর ইউনিয়নের শফি কাজীর মোড় এলাকা থেকে পদ্মা নদীতে অভিযান শুরু হয়। শফি কাজীর মোড় থেকে পালেরচর পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান চালানো হয়। একপর্যায়ে অভিযানের দলটি পালেরচর ইউনিয়নের নদীর উত্তর প্রান্তের কলিকাল চরে পৌঁছালে হামলার ঘটনা ঘটে।
সূত্রের দাবি, শতাধিক জেলে সংঘবদ্ধ হয়ে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে অভিযান দলের ওপর হামলা চালান। এ সময় নদীর পাড় থেকে ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করা হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত পাঁচজন সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা হামলাকারীদের ধাওয়া দেন। কয়েকজন জেলেকে নদীর চরের মধ্যে ঘিরে রাখা হয়।
সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ আসলাম বলেন, মৎস্য বিভাগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যাঁরা বর্তমানে নদীতে মা ইলিশ শিকার করছেন, তাঁদের কেউ নিবন্ধিত জেলে নন—এমন তথ্য-প্রমাণ তাঁদের কাছে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেন। মা ইলিশ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে মাছ শিকার, ইলিশ বিপণন, পরিবহন ও মজুতের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ২২ অক্টোবর পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা চলার কথা। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পদ্মা নদীর জাজিরা, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ অংশের বিভিন্ন স্থানে ইলিশ শিকারের অভিযোগ রয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের সূত্র বলছে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও শরীয়তপুরের নদীতীরবর্তী অন্তত ২৫টি স্থানে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। এসব স্থানে দিন-রাত ক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও কোস্টগার্ড অভিযান চালালেও ইলিশ শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে রোববার মা ইলিশ রক্ষায় মেঘনা নদীতে সরাসরি অভিযান চালান চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ। বিকেলে স্পিডবোট নিয়ে নদীর বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক টহল দেন তিনি। এ সময় নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও নৌকা জব্দ করা হয়। মাছ শিকারের প্রস্তুতি নেওয়া জেলেদের নদীতে না নামার জন্য সতর্ক করেন তিনি।
জেলেদের খাদ্যসহায়তা
শরীয়তপুর জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩৩ হাজার। তাঁদের মধ্যে ২৮ হাজার ৯২৯ জন ইলিশ শিকার ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। ৮ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিন নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় নিবন্ধিত জেলেদের ২৫ কেজি করে চাল খাদ্যসহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, খাদ্যসহায়তা দেওয়ার পরও জেলার কিছু এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের ঘটনা ঘটছে। অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হচ্ছে। গত ১০ দিনে ২০টি অভিযান চালিয়ে ৭২ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।