১০ লাখ টাকা ঋণ, সমপরিমাণ অনুদান; বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর, আবেদন করা যাবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত
তরুণদের নতুন ব্যবসা শুরু ও বিদ্যমান উদ্যোগ সম্প্রসারণে অর্থায়নের সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় আগামী ১ নভেম্বর থেকে দেশের অবশিষ্ট ৫৬ জেলার সব উপজেলায় আবেদন গ্রহণ শুরু হচ্ছে। এ কর্মসূচিতে নির্বাচিত একজন উদ্যোক্তা ব্যবসার প্রয়োজন ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আবেদন করা যাবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় কর্মসূচিটির লক্ষ্য উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা, তাঁদের ব্যবসায়িক উদ্যোগে অর্থায়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। নতুন ব্যবসা শুরুর পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপসহ বিভিন্ন বৈধ উদ্যোগ এ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে ১৮ হাজার ৪৪৪ আবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ে আট জেলার ৬৪টি উপজেলা থেকে মোট ১৮ হাজার ৪৪৪টি আবেদন জমা পড়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোণা জেলায় আবেদন গ্রহণ করা হয়।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে নেত্রকোণায়—৫ হাজার ৩৫১টি। রংপুরে ২ হাজার ৭৪৫টি, নওগাঁয় ২ হাজার ৪৫৬টি এবং ঝিনাইদহে ২ হাজার ১৯১টি আবেদন জমা পড়ে। এ ছাড়া হবিগঞ্জে ১ হাজার ৫৫২টি, ভোলায় ১ হাজার ৫৪৫টি, মানিকগঞ্জে ১ হাজার ৩৪৩টি এবং ফেনীতে ১ হাজার ২৬১টি আবেদন পাওয়া যায়। প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতার পর অবশিষ্ট ৫৬ জেলার সব উপজেলায় কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
কারা আবেদন করতে পারবেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। তাঁকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং নিজের ব্যবসায়িক ধারণা, নতুন ব্যবসা স্থাপনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা অথবা বিদ্যমান উদ্যোগ পরিচালনা ও সম্প্রসারণের প্রস্তাব থাকতে হবে। ব্যবসা আগে থেকেই চালু থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
তবে আগে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া ব্যক্তি এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবেন না। ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এ অর্থায়নের জন্য যোগ্য নন। আবেদনে অসত্য তথ্য দেওয়া কিংবা অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদন বাতিলসহ কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
ঋণ ও অনুদান কীভাবে দেওয়া হবে
কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা সমন্বিত অর্থায়ন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ৫০ শতাংশ ব্যাংকঋণ এবং বাকি ৫০ শতাংশ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। তবে প্রত্যেক আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পাবেন না। ব্যবসার প্রকৃত চাহিদা, প্রস্তাবিত ব্যয়, আর্থিক পরিকল্পনা এবং চূড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে নির্বাচিত উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। ঋণ ও অনুদানের অর্থ একই সময়ে এককালীন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এ কর্মসূচির ঋণের বিপরীতে সহায়ক জামানত না নিয়েও অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।
তবে অনুদান পেলেই তা নিঃশর্তভাবে ফেরত না দেওয়ার সুবিধা নিশ্চিত হয় না। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অথবা অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে রূপান্তরিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওই অর্থ সরকারি পাওনা হিসেবে আদায়যোগ্য হবে।
আবেদন করবেন যেভাবে
আগামী ১ থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় জমা দিতে হবে। আবেদন করার জন্য ওই ব্যাংকে আগে থেকেই হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আবেদন ফরম পাওয়া যাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এসএমই পোর্টাল এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা থেকেও ফরম সংগ্রহ করা যাবে।
- বাংলাদেশ ব্যাংক: https://www.bb.org.bd
- এসএমই পোর্টাল: https://www.bb.org.bd/smespd_portal
আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, সর্বশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি থাকে), পাসপোর্ট আকারের ছবি এবং যথাযথভাবে পূরণ করা আবেদন ফরম জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ওয়ার্ড কমিশনার বা কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিক সনদ বা প্রত্যয়নপত্রও প্রয়োজন হবে।
শুধু আবেদন করলেই মিলবে না অর্থায়ন
আবেদন জমা দেওয়ার পর ব্যবসায়িক ধারণার যৌক্তিকতা, বাজারের সম্ভাবনা, আর্থিক পরিকল্পনা, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা যাচাই করে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীজন যুক্ত থাকবেন।
প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়া ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। চূড়ান্ত মনোনয়নের পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুসারে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা, ব্যবসা পরিকল্পনা তৈরি, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে সহায়তার ব্যবস্থাও নীতিমালায় রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণদের ব্যবসায়িক উদ্যোগে অর্থায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।