যুদ্ধ-শান্তি, জলবায়ু, উন্নয়ন ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনায় ১৯৩ দেশের প্রধান প্ল্যাটফর্ম; ছোট ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ
আট দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্বের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। যুদ্ধ ও শান্তি, উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকারসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময়ে এর গুরুত্ব এখনো অটুট। নিউইয়র্কভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি বিষয়ক পরিচালক রিচার্ড গোয়ান মনে করেন, পরিবর্তনশীল ও বিভক্ত বিশ্বেও সাধারণ পরিষদের বিকল্প তৈরি হয়নি। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন সামনে রেখে ইউএন নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক ভূমিকা, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন।
গোয়ানের মতে, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় এর প্রতিষ্ঠাতারা মনে করেছিলেন, নিরাপত্তা পরিষদই হবে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র। কিন্তু সংস্থার কার্যক্রম শুরুর পর নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে দ্রুত বিভাজন তৈরি হয়। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধে নিরাপত্তা পরিষদ প্রায়ই অচল হয়ে পড়ত। ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা ও সিদ্ধান্তের অনেকটাই সাধারণ পরিষদে চলে আসে।
১৯৪০-এর দশক ও ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ও কোরিয়া পরিস্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ পরিষদ সক্রিয় ভূমিকা নেয়। কোরীয় যুদ্ধ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা যখন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন কোরিয়া পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে সাধারণ পরিষদ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে।
১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের সময়ও সাধারণ পরিষদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। গোয়ান বলেন, সুয়েজ সংকটের অবসানে জাতিসংঘের প্রথম সামরিক শান্তিরক্ষা অভিযান পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছিল সাধারণ পরিষদ। শীতল যুদ্ধের সময়ে সংকট ব্যবস্থাপনায় এটিকে তিনি পরিষদের অন্যতম বড় অবদান হিসেবে উল্লেখ করেন।
এরপর ১৯৬০-এর দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার বহু নতুন স্বাধীন দেশ জাতিসংঘে যোগ দিলে সাধারণ পরিষদের চরিত্রও বদলে যায়। নতুন রাষ্ট্রগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বার্থ তুলে ধরার জন্য পরিষদকে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। গোয়ানের ভাষায়, প্রতিষ্ঠাতারা হয়তো ধারণা করেছিলেন জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ৮০ বা ৯০টির মধ্যে থাকবে। কিন্তু উপনিবেশমুক্তির ধারায় সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপারথাইডবিরোধী আন্দোলনেও সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৬০-এর দশকজুড়ে পরিষদ দেশটির বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। গোয়ানের মতে, এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সম্মিলিত শক্তির উত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো অ্যাপারথাইড, আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনের অবশিষ্ট উপস্থিতি এবং ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য সাধারণ পরিষদ ব্যবহার করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়েও তারা সরব হয়। ১৯৭৪ সালে সাধারণ পরিষদ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য আরও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর পরবর্তী দুই দশক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামো ও বৈষম্য নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক বিতর্ক চলে।
গোয়ান বলেন, সাধারণ পরিষদ না থাকলে জাতিসংঘের বিপুলসংখ্যক সদস্যরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পেত না। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নিজেদের প্রত্যাশিত নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও বিশ্বপরিসরে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার একটি কার্যকর মঞ্চ পেয়েছে।
শীতল যুদ্ধের অবসানের পর কিছু সময় জাতিসংঘে সহযোগিতার পরিবেশও তৈরি হয়। কূটনীতিকেরা আদর্শগত মতপার্থক্য কিছুটা পাশে রেখে জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করতে সক্ষম হন। এ সময় শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের মতো নতুন উদ্যোগও গড়ে ওঠে। কমিশনটি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে ২০০৮ ও ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট আবার জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা সামনে আনে। অনেক সদস্যরাষ্ট্র সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের ভূমিকা চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান অর্থনীতিগুলো জি-২০-এর মাধ্যমে কাজ করার পথ বেছে নেয়। এতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
গোয়ানের মতে, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতারা যে কাঠামোর কথা ভেবেছিলেন, বাস্তবে সাধারণ পরিষদের ভূমিকা তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত হয়েছে। জাতিসংঘ বিশেষ করে সাধারণ পরিষদ উপনিবেশমুক্ত দেশগুলোকে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার এবং বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ দিয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে জি-৭, ব্রিকসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোট ও ফোরাম থাকলেও ছোট ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য সাধারণ পরিষদ এখনো প্রধান কূটনৈতিক মঞ্চ বলে মনে করেন গোয়ান। তাঁর মতে, বৈশ্বিক নানা বিষয়ে কথা বলার জন্য অনেক দেশের কাছে জাতিসংঘই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
জাতিসংঘের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে—এমন আলোচনা প্রায়ই হলেও প্রতি সেপ্টেম্বরেই সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বিপুলসংখ্যক বিশ্বনেতার সমাবেশ হয়। গোয়ানের ভাষায়, বৈশ্বিক কোনো জরুরি সংকটে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রয়োজন হলে দেশগুলো এখনো সাধারণ পরিষদের দিকেই ফিরে আসে। তাঁর মতে, এর কোনো সরাসরি বিকল্প নেই।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর থাকার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সদর দপ্তর অন্য কোনো শহরে স্থানান্তর করা সম্ভব হলেও নিউইয়র্কে থাকার কারণে বিশ্বনেতারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র থেকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পান। এ কারণেও সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে।