কিশোর সামিউল ইসলামের স্বপ্নের বিমান আকাশের বুকে পাখির মতো পাখা মেলে উড়ছে। কখনো দ্রুতগতিতে ওপরে উঠছে, আবার কখনো নিচে নেমে আসছে। রঙিন আকাশে উড়ন্ত এ বিমানে নেই কোনো পাইলট, নেই যাত্রীও। বিমানবন্দরের বিশাল রানওয়ে কিংবা আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে নেই রাডার। শুধু হাতে থাকা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বিমানটি আকাশে ওড়াচ্ছে সামিউল ইসলাম।
মাত্র ১৫ বছর বয়সী কিশোর সামিউল ইসলামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের রামেশ্বরপাড়ায়। সে স্থানীয় কাঁঠিবাড়ী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ছোটবেলা থেকেই আকাশে বিমান দেখলে কৌতূহল জাগত সামিউলের। সেই আগ্রহ থেকেই ইউটিউবে বিমান তৈরির বিভিন্ন ভিডিও দেখতে শুরু করে সে। শুধু ভিডিও দেখেই থেমে থাকেনি; সেগুলো অনুসরণ করে নিজেই তৈরি করেছে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমান। নিজের তৈরি বিমানটি রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে আকাশে উড়িয়ে গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সামিউল।
সামিউলের তৈরি বিমান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভিড় করছেন। শহর থেকেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ছুটে আসছেন তার তৈরি বিমান দেখতে।
উদ্ভাবনী চিন্তা থেকেই ছোটবেলার স্বপ্ন বুনতে শুরু করে সামিউল। ইউটিউবে বিমান তৈরির বিভিন্ন ভিডিও দেখে সে কাজ শুরু করে। শুধু ভিডিও দেখেই থেমে থাকেনি। নিজের টিফিনের টাকা জমাতেও শুরু করে। প্রায় এক মাসের চেষ্টায় তৈরি করে ৫৪ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমান। এতে ব্যবহার করেছে ২২০০ কেভি মোটর।
সামিউল ইসলাম বলে, বিমানটি প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশে উড়তে পারে। এটি তৈরি করতে তার প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। স্কুলের টিফিনের টাকা জমিয়ে সে কাজ শুরু করেছিল। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বাবা ও চাচাদের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে। শুরুতে ছেলের এমন কাজে পরিবারের আপত্তি ছিল। সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তাকে বকাঝকাও শুনতে হয়েছে। তবে তাতে দমে যায়নি সামিউল। চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বিমানটি ওড়াতে সক্ষম হয়েছে।
সামিউলের তৈরি বিমানটি এখনো কোনো কিছু বহন করতে পারে না। তবে তার স্বপ্ন অনেক বড়। ভবিষ্যতে মানুষ বহনে সক্ষম জেট বিমান তৈরির স্বপ্ন রয়েছে তার। পাশাপাশি বিমান প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে কাজ করতে চায় এই শিক্ষার্থী।
এদিকে সামিউলের এ উদ্যোগে মুগ্ধ সহপাঠী ও এলাকাবাসী। তার তৈরি বিমান দেখতে প্রতিদিনই অনেক মানুষ ভিড় করছেন। পরিবারের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সামিউল ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু করার সুযোগ পাবে।
সামিউলের সহপাঠী রবিউল ইসলাম বলে, “আমরা আমাদের সহপাঠীর জন্য গর্বিত। সামিউলের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। সে খুবই মেধাবী। অল্প দিনের মধ্যেই একটি বিমান বানিয়েছে। আমরা চাই, সে ভবিষ্যতে বিমান তৈরির কাজে যুক্ত হোক।”
সামিউলের মা আমেনা বেগম বলেন, “ছেলে বিমান বানিয়েছে, এতে আমি খুব খুশি। আমি চাই, সে বিমান তৈরির কাজ করুক। সরকার যদি ছেলেটির দিকে একটু নজর দিত, তাহলে সে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারত। এজন্য সরকারের কাছে আবেদন, সরকার যেন আমার ছেলের জন্য কিছু করে।”
সামিউলের শিক্ষক আবদুল হামিদ বলেন, “সামিউল খুব শান্ত স্বভাবের। কিন্তু সে এতটা মেধাবী, তা আগে জানা ছিল না। তার তৈরি বিমান উড়তে দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। আশা করি, সরকার এ ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াবে। তারাই একদিন দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে।”