রাজশাহীর পুঠিয়ায় একটি বিদ্যালয়ের মাঠে কলাগাছ লাগিয়ে এবং প্রধান ফটকে বাঁশের বেড়া দিয়ে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক দাতা সদস্য আজাদ আলীর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের কার্যালয়ের দরজায় আগে থেকে থাকা তালার ওপর নতুন করে তালা লাগানো হয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে উপজেলার ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুলে এ ঘটনা ঘটে। আজাদ আলীর দাবি, টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জমি দিয়েছিলেন এবং তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূকে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টেকনিক্যাল কলেজ হয়নি এবং তাঁর পুত্রবধূকে চাকরি দেওয়া হয়নি। এ কারণেই তিনি বিদ্যালয়ে তালা দিয়েছেন ও মাঠে কলাগাছ লাগিয়েছেন।
তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজার দাবি, আজাদ আলীর পুত্রবধূকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করলে নতুন পুত্রবধূকেও চাকরি দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি সম্মতি দিয়েছিল। এ বিষয়ে কমিটির রেজুলেশন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্র ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার বেলা ১১টার দিকে আজাদ আলী লোকজন নিয়ে বিদ্যালয়ে যান। তাঁরা শিক্ষকদের কার্যালয়ের দরজায় আগে লাগানো তালার ওপর আরেকটি তালা দেন। এরপর প্রধান ফটকে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের মাঠ ও ভেতরের ফাঁকা জায়গায় কলাগাছের চারা লাগানো হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে ফটকে বাঁশের বেড়া ও বিদ্যালয়ের ভেতরে লাগানো কলাগাছের চারা দেখা গেছে।
স্থানীয় দোকানি লাল মোহাম্মদ বলেন, একসময় বিদ্যালয়টিতে অনেক শিক্ষার্থী ছিল। মামলা ও বিরোধের কারণে শিক্ষার্থী কমেছে। এরপরও সেখানে ক্লাস চলছিল। শনিবারের ঘটনার পর বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে পুঠিয়ার ভালুকগাছি গ্রামে ‘মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদানের পরিকল্পনা ছিল। তবে সব স্তরে পাঠদানের অনুমোদন তখন পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি পায় প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের পাশাপাশি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পাঠদান চলছে। শিক্ষার্থীরা ওপরের শ্রেণিতে উঠলে পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠদান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে চিঠি দেয়। পরে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ‘ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল’ নাম নির্ধারণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট রেজুলেশনে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবদাতা হিসেবে আজাদ আলীর নাম রয়েছে বলে বিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে। ফলে নাম পরিবর্তন নিয়েও তাঁর সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরোধ তৈরি হয়েছে।
আজাদ আলী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই তিনি জমি দিয়েছিলেন। সেখানে টেকনিক্যাল কলেজ করার কথা ছিল এবং তাঁর ছেলে ও ছেলের বউকে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান হয়নি। তাঁর পুত্রবধূকেও চাকরি দেওয়া হয়নি। এ কারণেই তিনি বিদ্যালয়ে তালা দিয়েছেন ও কলাগাছ লাগিয়েছেন।
তবে প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, আজাদ আলী শুরুতে নিঃশর্তভাবে প্রতিষ্ঠানকে জমি দান করেছিলেন। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিয়ে প্রতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু করতে বলেছিলেন। স্থাপনা নির্মাণের পর প্রতিষ্ঠানের নামে জমি রেজিস্ট্রি করার সময় তিনি তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূর চাকরির দাবি করেন।
প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য, কলেজ শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে দেরি হওয়ায় আজাদ আলীর পুত্রবধূকে প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। চাকরিরত অবস্থায় ২০২২ সালে তিনি মারা যান। পরে আজাদ আলী তাঁর ছেলের দ্বিতীয় স্ত্রীকে মাধ্যমিক শাখায় কেরানি পদে চাকরি এবং ছেলেকেও একটি পদে নিয়োগের প্রস্তাব দেন। ব্যবস্থাপনা কমিটি এতে সম্মতি দিয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট রেজুলেশন রয়েছে বলে দাবি করেন প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের জমি ও প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে বিরোধ গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। প্রধান শিক্ষক জানান, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আজাদ আলী রাজশাহীর আদালতে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, যে নামে প্রতিষ্ঠান করার জন্য তিনি জমি দিয়েছিলেন, সেই নামে প্রতিষ্ঠান করা হয়নি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। মামলা চলমান থাকার মধ্যেই বিদ্যালয়ে তালা, বাঁশের বেড়া ও কলাগাছ লাগানোর ঘটনা ঘটল।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একদিনে দাঁড়িয়ে যায় না। দাতা সদস্যের অভিযোগ সঠিক নয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে এবং নিয়মিত পাঠদান চলছে। তাঁর ভাষ্য, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন দিয়েছে।
এদিকে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরেও এসেছে। পুঠিয়ার ইউএনও লিয়াকত সালমান জানিয়েছেন, তিনি ঘটনা সম্পর্কে অবগত। তিনি ঢাকায় অবস্থান করায় তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। ফিরে গিয়ে বিদ্যালয়টি চালুর ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পেছনে যে ঘটনাই থাকুক, শিক্ষার্থী থাকলে কোনো ব্যক্তি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখতে পারেন না।
জমি, প্রতিষ্ঠানের নাম, পরিবারের সদস্যদের চাকরি এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত—এসব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে এখন সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কীভাবে নির্বিঘ্ন রাখা হবে, সেটিই এখন স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।