লক্ষ্মীপুরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৪৮ গ্রাহকের ১ কোটি ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় জালিয়াতির কৌশল উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্তের পর মামলার মূল আসামি মো. নাছির উদ্দিন ওরফে খোকন আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
সোমবার পিবিআই নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আর এম ফয়জুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর তা ব্যাংকের হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হতো। এ জন্য গ্রাহকদের বলা হতো, ব্যাংকের সার্ভারে সমস্যা রয়েছে। পরে ভুয়া স্লিপ, হাতে লেখা জমার রসিদ এবং জাল বায়োমেট্রিক ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজ ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিশ্বাস করানো হতো যে তাঁদের টাকা ব্যাংকে জমা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামি নাছির উদ্দিন (৫৫) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সাহাপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি ২০১৯ সাল থেকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতাধীন মিরিকপুর শাখার একটি আউটলেটের দায়িত্বে ছিলেন। সেখানে সহযোগী হিসেবে মো. শহিদুল্লাহ ওরফে জিয়াকে নিয়োগ দেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নাছির উদ্দিন ও শহিদুল্লাহ পরস্পরের যোগসাজশে এ প্রতারণা চালান। বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকেরা তাঁদের সঞ্চয়ের টাকা জমা দিলেও সেই অর্থ ব্যাংকের হিসাবে জমা করা হয়নি। বরং গ্রাহকদের হাতে এমন কাগজ দেওয়া হতো, যাতে তাঁদের মনে হয় টাকা যথাযথভাবে ব্যাংকে জমা হয়েছে।
এভাবে ৪৮ জন গ্রাহকের কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনাটি নিয়ে ২০২৫ সালের ১ জুলাই লক্ষ্মীপুর সদর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৮, ৪০৯ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। মামলা হওয়ার প্রায় এক মাস পর, একই বছরের ৩ আগস্ট নাছির উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও মামলার অর্থ আত্মসাতের পুরো কৌশল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। পরে লক্ষ্মীপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পিবিআই নোয়াখালীর কাছে দেওয়া হয়।
তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআইয়ের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ব্যাংকিং লেনদেন, গ্রাহকদের দেওয়া কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই শুরু করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মো. কামাল আব্বাস আদালতের অনুমতি নিয়ে নাছির উদ্দিনকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পিবিআই। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ আত্মসাতের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসে।
এরপর গত ২২ আগস্ট বিকেলে লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ক্ষমতাপ্রাপ্ত) তাসলিমা ইসলামের আদালতে হাজির করা হয় নাছির উদ্দিনকে। সেখানে তিনি স্বেচ্ছায় হত্যার নয়, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
পিবিআই বলছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর ব্যাংকের হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করাই ছিল প্রতারণার মূল কৌশল। সার্ভারে সমস্যা থাকার কথা বলে গ্রাহকদের অপেক্ষায় রাখা এবং পরে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া কাগজপত্র দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি আড়াল করা হয়।
এ ঘটনায় শুধু মূল আসামির ভূমিকা নয়, পলাতক অন্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্ত করছে পিবিআই। তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পিবিআই নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আর এম ফয়জুর রহমান বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটির নিরবচ্ছিন্ন তদন্ত করা হয়েছে। আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার এবং ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পরে তিনি আদালতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, মামলার সঙ্গে জড়িত পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে আত্মসাৎ করা ১ কোটি ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা পুরোপুরি উদ্ধার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। গ্রাহকদের অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা চিহ্নিত করাই এখন তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।