জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয়ে বড় ধরনের বৃদ্ধি ও বিপুল লোকসানের কারণে দেশে আবারও চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়ে রোববার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।
নতুন দরে ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে এসব জ্বালানির দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। নতুন দাম দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। মে মাসে গত বছরের ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকার তুলনায় ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। আগস্টে ২ হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।
বিপিসির হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এপ্রিলে লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ অবস্থায় গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় বিপিসি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত লোকসানের অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক-কর কমানো বা প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি।
বিপিসির অর্থসংকট নিয়ে গত সপ্তাহে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকও হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে বিপিসির হাতে জ্বালানি আমদানির জন্য মাত্র ১৫ দিনের অর্থ থাকার বিষয়টি উঠে আসে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্থাটিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এখনো সেই অর্থ ছাড় হয়নি।
বিপিসি জানিয়েছে, চলতি বছর জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ দুই মাসের জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
রোববারের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সময়ই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। সোমবার সকালে ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে চলতি সপ্তাহে কূটনৈতিক উদ্যোগ আসতে পারে—এমন আশায় তেলের সরবরাহ নিয়ে বাজারের উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ আংশিক স্বাভাবিক হওয়ার খবরও বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে নেমে আসে। আগের দিনের তুলনায় কমেছে ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ১৫ ডলার বা ২ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে নেমেছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনায় তেলের দামে যুক্ত থাকা ঝুঁকির প্রিমিয়ামের একটি অংশ কমছে। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ও রোববার এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে ১২টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগের সপ্তাহান্তে এ সংখ্যা ছিল ৩৫টি। অর্থাৎ এক সপ্তাহে জাহাজ চলাচল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। একই সময়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের হুমকির মাত্রা এখনো গুরুতর। গত তিন দিনে এ পথে জাহাজে অন্তত তিনটি হামলার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও কূটনৈতিক তৎপরতার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে দ্রুত ওঠানামা করছে। এর মধ্যেই দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।