হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধে দিল্লির নিশ্চয়তা চাইছে ঢাকা, তারপরই তারেকের ভারত সফর

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে এই বিষয়টি। সফর চূড়ান্ত করার আগে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধে ভারতের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ।

বিবিসি বাংলার ১৪ আগস্টের প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভারত এ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আশ্বাস দিলেও ঢাকার চাওয়া হচ্ছে **পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা**। এই নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।

বিষয়টি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক আস্থা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

ঢাকার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা এবং পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে থেকে কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন—এটি এখন দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানেই ঢাকার অবস্থানের তাৎপর্য।

বাংলাদেশ হয়তো চাইছে, ভারতের কাছ থেকে এমন একটি স্পষ্ট অবস্থান, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি না হয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হতে পারে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২১-২২ আগস্ট দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।

সফরটি বাস্তবায়িত হলে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব হবে যথেষ্ট।

কারণ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার পর ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের অন্যতম প্রধান জটিলতা হয়ে ওঠে তাঁর অবস্থান।

অন্যদিকে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনও বাস্তব প্রয়োজন। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ—এসব বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাই তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে শুধু সৌজন্য সফর হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি হতে পারে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ।

ভারতের দিক থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

তবে ভারত একই সঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটিও বিবেচনা করছে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁকে আশ্রয় দেওয়াও সেই সম্পর্কের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ।

এখন নতুন বাস্তবতায় দিল্লিকে একদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ঢাকার উদ্বেগও সামলাতে হচ্ছে।

এই দ্বৈত বাস্তবতাই তারেক রহমানের সফরকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন সম্ভবত আস্থার ঘাটতি। ঢাকার দৃষ্টিতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। অন্যদিকে দিল্লির দৃষ্টিতে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুরোনো নিরাপত্তা ও কৌশলগত সমীকরণ বদলে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দিল্লি সফর সফল করতে হলে শুধু বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি যথেষ্ট হবে না। উভয় পক্ষকেই কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে বাস্তব সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধের বিষয়ে ঢাকার চাওয়া সেই সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এর বাইরে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনও বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে।

বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে বাংলাদেশ এখনো ওই সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

অর্থাৎ, সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর এবং ব্রিকস সম্মেলন—দুটি ঘটনাই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো সফরের তারিখ নয়, বরং সফরের আগে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কী ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের সমাধান না হলে নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও পুরোনো অবিশ্বাসের ছায়া থাকতে পারে। আবার ভারত যদি ঢাকার উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে একটি স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সেটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে।

তাই তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত রাজনৈতিক গুরুত্ব ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের প্রথম বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ হতে পারে।

উল্লেখ্য, ওপরের বিশ্লেষণটি আপনার দেওয়া বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে লেখা; সম্ভাব্য সফরের তারিখ ও কূটনৈতিক নিশ্চয়তার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্রনির্ভর।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত