দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পর সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘হায়াত তাহরির আল-শাম’ (এইচটিএস)-এর ওপর থেকেও সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তকে সিরিয়ার জন্য ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন দেশটির নতুন নেতৃত্ব। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেছেন, ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ জুলাই সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ দিনের বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা শেষে সোমবার সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে সিরিয়াকে পুরোপুরি দূরে রাখার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ও ইতিবাচক পদক্ষেপের স্বীকৃতি হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান আহমেদ আল-শারা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সিরিয়া তার ‘বেদনাদায়ক অতীত’ পেছনে ফেলে উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও দেশ গড়ার নতুন যুগে প্রবেশ করছে।
সিরিয়াকে ১৯৭৯ সালে ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকায় যুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর ছেলে বাশার আল-আসাদের দীর্ঘ শাসনকালেও এই তালিকা বহাল থাকে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযানে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর সিরিয়ায় রাজনৈতিক পালাবদলের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। শারা নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকার কারণে সিরিয়ার ওপর দীর্ঘদিন ধরে কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। বৈদেশিক সাহায্য, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি, নির্দিষ্ট দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে দেশটির ওপর নানা বিধিনিষেধ ছিল। ফলে বিদেশি ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছেও সিরিয়া ছিল উচ্চঝুঁকির একটি দেশ।
এ তালিকা থেকে বাদ পড়ার ফলে সিরিয়ার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং লেনদেন, বাণিজ্য এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের ওপর থেকেও সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা তুলে নেওয়া। গোষ্ঠীটি আগে ‘আল-নুসরা ফ্রন্ট’ নামে পরিচিত ছিল এবং একসময় আল-কায়েদার সিরীয় শাখা হিসেবে কাজ করেছিল।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের পরিবর্তনের বিষয়টিও এ সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আহমেদ আল-শারা এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ফলে সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতার কাছ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরের শারার প্রচেষ্টাও নতুন গতি পেয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে। সিরিয়ায় ইরান ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রভাব কমিয়ে দেশটিকে পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা হিসেবে বিষয়টিকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বাশার আল-আসাদের আমলে তেহরান ও মস্কো সিরিয়ার অন্যতম প্রধান মিত্র ছিল।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সিরিয়ার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সিরিয়ায় মার্কিন আর্থিক সহায়তা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগের পথও সহজ হতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, এই পদক্ষেপ সিরিয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে সিরিয়াকে নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্ত করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এ সিদ্ধান্ত তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ সিরিয়া ও পুরো অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সাফওয়াত রাসালানও সিদ্ধান্তটিকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এর মাধ্যমে সিরিয়াকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সিরিয়ার অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বারনিহ এই সিদ্ধান্তকে কূটনীতির বড় সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সিরিয়ার পুনঃসংযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি আকর্ষণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুযোগ এখন আরও উন্মুক্ত হয়েছে।
সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাকও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতা থেকে অংশীদারিত্বে এবং সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে বিবেচিত একটি দেশ থেকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদারে পরিণত হওয়ার পথে সিরিয়ার জন্য এটি একটি নির্ণায়ক পদক্ষেপ।
তবে নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানেই সিরিয়ার ওপর থাকা সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে উঠে যাওয়া নয়। দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা ফেরানোর পথ এখনো দীর্ঘ। বিশেষ করে নতুন সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা আগামী দিনে ওয়াশিংটনের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
তবু ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ অধ্যায়ের পর সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল এবং সিরিয়াকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বের নীতির পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।