নেপাল–তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক হড়পা বানে ব্যাপক প্রাণহানির পর দুর্যোগটির উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। নেপালের রাসুয়া জেলায় বুধবার সকালে ভোটেকোশী নদীতে নেমে আসা এই বানে মৃতের সংখ্যা ১০০ জনে পৌঁছেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে। এখনো ৫০০-এর বেশি পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ রয়েছেন সেনা, পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের কয়েক ডজন কর্মীও।
হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় আকস্মিক বন্যার উৎস শনাক্ত করা সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে তিব্বতের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মানুষের উপস্থিতি খুবই কম। ফলে কোনো হিমবাহ, বরফের স্তর কিংবা নদীপথে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি নজরে আসার সুযোগ সীমিত।
এবারের বন্যার ক্ষেত্রেও ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে একটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। তাঁদের দেখা কিছু ছবিতে তিব্বত অংশের একটি পাহাড় থেকে বিশাল বরফের খণ্ড ধসে পড়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, ওই বরফধসের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিমাটিও নিচে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরফ ও পাথরের এই বিশাল স্তূপ নিচে নামার সময় ঘর্ষণের ফলে কিছু পরিমাণ পানি তৈরি হতে পারে। এরপর সেগুলো লেহন্দে নদীর ওপর পড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেয়। এতে নদীর উজানে দ্রুত পানি জমতে থাকে। একপর্যায়ে পানির চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে ওই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যায়। তখন বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও পলিমাটি একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে গিয়ে হড়পা বানের সৃষ্টি করতে পারে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থও একই ধরনের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, লেহন্দে নদীর প্রবাহ কোনোভাবে আটকে গিয়ে উজানে পানি জমেছিল। পরে সেই বাধা ভেঙে জমে থাকা পানি পাথর ও অন্যান্য উপাদান সঙ্গে নিয়ে ভোটেকোশী নদীতে প্রবেশ করে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, হড়পা বানটি চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের দিক থেকে নেমে এসেছে বলে মনে হয়েছে। তবে ঠিক কোন স্থানে কী ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করেও দুর্যোগের উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ঘটনাস্থলের ওপর মৌসুমি মেঘ থাকায় এখন পর্যন্ত পাওয়া ছবিগুলো যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। ফলে পাহাড়ের কোথায় বরফধস হয়েছে, কোথায় নদীর গতিপথ আটকে গিয়েছিল এবং কীভাবে সেই বাধা ভেঙেছে—এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি।
চীনের কয়েকজন নেপালি শিক্ষাবিদ জানিয়েছেন, চীনা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও তাঁরা বরফ ও পাথরধসের মতো ব্যাখ্যা শুনেছেন। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টে ঘটনাটিকে নেপালের ভূমিধস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দুর্যোগটির প্রকৃত উৎস নিয়ে এখনো বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার কারণে এই বিপুল জলরাশি নেমে আসতে পারে। হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা ‘গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা নামে পরিচিত। পাহাড়ের ওপর হিমবাহ গলে বা বরফধসে পানি জমে বিশাল হ্রদ তৈরি হলে কোনো সময় সেই হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি নিচে নেমে আসতে পারে।
তবে কয়েকজন হিমবাহবিজ্ঞানী এবারের ঘটনায় এমন কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁদের বিশ্লেষণে বরং সরাসরি বরফধস, ভূমিধস অথবা পাথর–বরফের বিশাল স্তূপের কারণে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে হচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনা নেপালের জন্য একেবারেই নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়েও ভোটেকোশী নদীতে একই ধরনের আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। সে সময় অনুসন্ধানে দেখা যায়, নেপাল–চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে লেহন্দে নদীতে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে একই নদী অববাহিকায় আবারও ভয়াবহ হড়পা বান হওয়ায় হিমালয় অঞ্চলের পরিবর্তনশীল পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হিমালয়ের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে অনেক হিমবাহ দ্রুত গলছে। বরফের স্তর পাতলা হওয়ার পাশাপাশি হিমবাহের সামনে ও আশপাশে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধস ও বরফধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায়ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার সঙ্গে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। গবেষণাটিতে বলা হয়েছিল, শতাব্দীর শুরু থেকে হিমালয়ের অনেক হিমবাহ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ হারাচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু পানির পরিমাণের পরিবর্তন নয়, পাহাড়ি নদীগুলোর আচরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনকে এবারের নির্দিষ্ট বন্যার সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আরও তথ্য প্রয়োজন। কারণ আকস্মিক হড়পা বান সাধারণত একাধিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফল হতে পারে—বরফধস, ভূমিধস, নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে সেই বাধা ভেঙে যাওয়া—সবকিছু মিলেই কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভয়াবহ জলপ্রবাহ তৈরি হতে পারে।
এবারের ঘটনার ক্ষেত্রেও তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘটনাস্থলের পরিষ্কার স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন বা আকাশপথে সংগৃহীত তথ্য এবং ভূতাত্ত্বিক নমুনা। লেহন্দে নদীর কোন অংশে বাধা তৈরি হয়েছিল, সেখানে বরফ ও পাথরের কী ধরনের স্তর জমেছিল এবং সেই বাধা কীভাবে ভেঙেছে—এসব তথ্য পাওয়া গেলে বন্যার উৎস অনেকটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
হিমালয়ের এই অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম। নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী পাহাড়ে সামান্য একটি বরফধসও নিচের নদীতে বিশাল জলপ্রবাহ তৈরি করতে পারে। আর সেই পানি যখন সরু পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে দ্রুত নিচে নামে, তখন কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর স্বাভাবিক স্রোত ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক শক্তিতে পরিণত হয়।
এ কারণে এবারের নেপাল–তিব্বত সীমান্তের বিপর্যয় শুধু একটি আকস্মিক বন্যার ঘটনা নয়; হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিবেশ, গলতে থাকা হিমবাহ এবং পাহাড়ি নদীর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সম্পর্কেও এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে ঠিক কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে, তার চূড়ান্ত উত্তর পেতে আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরিষ্কার উপগ্রহচিত্রের অপেক্ষা করতে হবে।