ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) অনুযায়ী নাগরিকত্বের জন্য জমা পড়া আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আসা হিন্দু শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্বের সনদ দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক দপ্তর নবান্নে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, সিএএর অধীনে পশ্চিমবঙ্গে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২৩ হাজার আবেদনকারী ইতিমধ্যে নাগরিকত্বের সনদ পেয়েছেন। বাকি ২ লাখ ৭ হাজার আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সিএএর অধীনে নাগরিকত্বের আবেদনসংক্রান্ত শুনানি জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। এরপর যোগ্য আবেদনকারীদের দ্রুত নাগরিকত্বের সনদ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা হিন্দুদের আবেদনও দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। যারা এখনো সিএএর অধীনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেননি, তাদেরও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের সনদের অপেক্ষায় থাকা মতুয়া সম্প্রদায়সহ অন্যান্য হিন্দু শরণার্থীদের উদ্দেশে শুভেন্দু বলেন, “তারা আমার কাছ থেকেই এই সনদ পাবেন। ভারত সরকার আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে।”
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মতুয়া সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ একটি জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এই সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। নাগরিকত্বের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু।
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইনটি নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালে আইনটি পাস হলেও এর বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ১১ মার্চ দেশজুড়ে এটি কার্যকর করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
আইনটির আওতায় পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—আবেদনকারীকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করতে হবে।
সিএএ নিয়ে শুরু থেকেই ভারতে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রতিবাদ হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার মাধ্যমে আইনটি ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে ভারত সরকার বলে আসছে, প্রতিবেশী তিন দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার সংখ্যালঘুদের মানবিক কারণে নাগরিকত্ব দেওয়াই এই আইনের উদ্দেশ্য।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে সিএএ বাস্তবায়নের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ রাজ্যটিতে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস রয়েছে। তাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করছে।
২০২৬ সালের আগস্টে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে সিএএর অধীনে আবেদনকারীদের শুনানি গ্রহণ এবং নাগরিকত্বের সনদ দেওয়ার প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয়। এরপর রাজ্য সরকার আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়।
এর আগে গত ১ আগস্ট শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে সিএএর অধীনে থাকা সব মুলতবি আবেদন আগামী ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এবার তিনি আবারও আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার কথা জানালেন।
তবে নাগরিকত্বের সনদ পাওয়ার আগে আবেদনকারীদের পরিচয়, ভারতে প্রবেশের সময়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং আইনের নির্ধারিত যোগ্যতা যাচাই করা হবে। ফলে সব আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাবেন—এমন নয়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২ লাখ ৩০ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ২৩ হাজার জন এখন পর্যন্ত নাগরিকত্বের সনদ পেয়েছেন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক আবেদন এখনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এসব আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হলে রাজ্যে সিএএ বাস্তবায়নের কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই ঘোষণা দুই দেশের সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী ও রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে নাগরিকত্বের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। এখন তাদের আবেদনগুলো কত দ্রুত যাচাই-বাছাই শেষ করে সনদ দেওয়া হয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।