বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে রাষ্ট্রদূতদের মন্তব্য করা উচিত নয়। বাংলাদেশের মানুষ ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারই দেশের মানুষের জন্য কী ভালো, তা সবচেয়ে ভালো বোঝে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী এসব কথা বলেন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া টানাপোড়েনের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘আমি একজন রাষ্ট্রদূত। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আমরা কিছু বলতে চাই না, আমাদের কোনো কথা বলাও উচিত নয়।’ দীনেশ ত্রিবেদী আরও বলেন, ‘দেশের মানুষ এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারই সবচেয়ে ভালো বোঝে, দেশের মানুষের জন্য কী ভালো।’
সম্পর্কের ভিত্তি মানুষে-মানুষে যোগাযোগ
বাংলাদেশে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ককে কোন জায়গায় দেখতে চান—এমন প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী মানুষে-মানুষে যোগাযোগকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সব সময়ই মানুষে-মানুষে সম্পর্ক চাই। দিল্লিতে বাংলাদেশের যে প্রতিনিধি আছেন, তিনিও একই কথা চান—কীভাবে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও ভালো করা যায়।’
দুই দেশের সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলেও তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে উল্লেখ করে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা দুই দেশেরই দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমরা যা সিদ্ধান্ত নিই, তার প্রভাব তো সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। তাই সাধারণ মানুষের জন্য যা ভালো, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা সব সময় বলি, আমরা একটি স্বপ্ন ভাগাভাগি করি।’
‘প্রতিবেশী হিসেবে কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়’
বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন সীমান্ত এবং দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক দায়িত্বও অনেক বেশি। তিনি বলেন, ‘আমরা সীমান্ত ভাগাভাগি করি। সে কারণে আমাদের দায়িত্বও বেড়ে যায়। প্রতিবেশী হিসেবে আমি সব সময় বলি—আমরা সমান। কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়।’ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতকে একে অপরের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ বুঝতে হবে।
‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ বুঝতে হবে’
বাংলাদেশ ও ভারতের নিজ নিজ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ভারতীয় হাইকমিশনার। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ থাকবেই। আমাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জগুলো কী। বাংলাদেশকেও বুঝতে হবে ভারতের চ্যালেঞ্জগুলো কী। এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’ তবে অতীতের ঘটনাকে সামনে রেখে সম্পর্ককে আটকে না রেখে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা অতীত ভুলতে পারি না। কিন্তু অতীতে আটকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আটকে গেলে উন্নয়নের কাজ হবে না।’
বাণিজ্য ও মুক্ত বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা
সৌজন্য সাক্ষাতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান দীনেশ ত্রিবেদী। বিশেষ করে দুই দেশের মানুষের স্বার্থে বাণিজ্য আরও সহজ করা এবং মুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য বাণিজ্য, মুক্ত বাণিজ্য—কীভাবে আমরা দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য করতে পারি, তা নিয়েও কথা হয়েছে।’ বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
‘৩০ মিনিটেই অনেক কিছু শিখেছি’
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশে এসে তিনি মন্ত্রীর অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসে অনেক কিছু শিখছি। মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ৩০ মিনিট ছিলাম। এই ৩০ মিনিটেই অনেক কিছু শিখেছি। কারণ মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁর যে অভিজ্ঞতা, তার কোনো শেষ নেই।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনা
সাক্ষাৎটি মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে ভারতের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাতেই ভারতীয় হাইকমিশনার সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। এর পাশাপাশি দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মীর শাহে আলম বলেন, ‘এটি একেবারেই সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। পাশাপাশি আমাদের মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করাকে সরকার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু আমরা গণতান্ত্রিক সরকার এবং মানুষের ভোটে নির্বাচিত, তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা আমাদের দায়িত্ব।’ তিনি আরও জানান, বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে মন্ত্রী ও তিনি তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেছেন।
দুই দেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, বৈঠকের বাকি আলোচনা ছিল সৌজন্য, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে এদিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি মন্তব্য না করার ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে মানুষের কল্যাণ, পারস্পরিক সমতা, বাণিজ্য এবং ভবিষ্যতমুখী সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।