কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশের বাসিন্দাদের বড় অংশ দেশটির সঙ্গেই থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে জাতীয় ঐক্যের পক্ষে ৭৬ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার তথ্য উঠে এসেছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বড় ধাক্কা খেয়েছে।
কানাডার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি ও বেসরকারি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিটিভির হিসাব অনুযায়ী, ভোট গণনার এক-তৃতীয়াংশ শেষে জাতীয় ঐক্যের পক্ষের ভোটাররা বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। তবে প্রাথমিক ফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পূর্ণাঙ্গ ফল নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই গণভোট আয়োজনের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোট আয়োজনের সময়টি ছিল ‘সবচেয়ে অনুপযুক্ত’। তিনি বলেন, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার হুমকি দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে কানাডার জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
তবে গণভোটে পিছিয়ে পড়লেও স্বাধীন আলবার্টার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা। ‘আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট’-এর শীর্ষ নেতা জেফরি র্যাথ সাংবাদিকদের বলেন, ফলাফল যা-ই হোক, স্বাধীন আলবার্টা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই লড়াই থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি।’
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থক জুর ডেইন ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করেছেন। ৪০ বছর বয়সী ডেইন বলেন, কানাডার অংশ হিসেবেই থাকার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তিনি আলবার্টা ছেড়ে চলে যাবেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের ইচ্ছার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে এডমন্টনে জাতীয় ঐক্যের পক্ষের সমর্থকেরা ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ‘ফরেভার কানাডিয়ান’ সংগঠনের প্রধান থমাস লুকাসজুক বলেন, কানাডীয়দের মধ্যে এমন উৎসাহ ও দৃঢ় সংকল্প দেখা ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা।
আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ জানিয়েছেন, তিনি স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাঁর দাবি, প্রদেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভাজনমূলক বিতর্কের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, জাতীয় ঐক্যের পক্ষের জয় স্বাধীনতার প্রশ্নে বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে।
তেলশিল্প ঘিরে ক্ষোভ
আলবার্টায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলের মজুত রয়েছে। প্রদেশটির অর্থনীতিতে তেলশিল্পের গুরুত্ব এবং তেল উৎপাদন ও রপ্তানির নীতিমালা ঘিরে অসন্তোষ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব জোরালো হওয়ার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নীতিকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, জলবায়ুবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের নামে ট্রুডো সরকার আলবার্টার তেলশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল।
আলবার্টার স্বাধীনতার দাবি কানাডার বাইরেও, বিশেষ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে সমর্থন পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন এবং ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ইলন মাস্কও চলতি মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আলবার্টার ‘আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত’।
বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং রিপাবলিকান রাজনৈতিক কর্মীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব যোগাযোগ আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে ঘিরে বিদেশি প্রভাবের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
অটোয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা
আলবার্টায় বেড়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রদেশটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করছেন। প্রিমিয়ার স্মিথের সঙ্গে মিলে তিনি আলবার্টা থেকে বিদেশে বিটুমিন—এক ধরনের ভারী অপরিশোধিত তেল—রপ্তানির জন্য নতুন পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ট্রুডো সরকারের আমলে যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন বলে বিবেচিত হয়েছিল, সেটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।
তবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযোগ, গণভোটের প্রচারণার শেষ দিকে কার্নি আলবার্টার ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্টের নেতা মিচ সিলভেস্ট্রে দাবি করেন, কার্নির বার্তা ছিল—কানাডার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বিপজ্জনক। তিনি এ বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত অযৌক্তিক’ বলে সমালোচনা করেন।
তবে প্রদেশটির সব ভোটার বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নকে একইভাবে দেখছেন না। এডমন্টনে ভোট দেওয়া ৪৪ বছর বয়সী হেইলি এরডেগার্ড বলেন, আলবার্টার তেল থেকে অর্জিত আয়ের বড় অংশ কানাডার অন্য অঞ্চলগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়—বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এমন প্রচারণা তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তাঁর মতে, আলাদা দেশ গঠনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক ফল জাতীয় ঐক্যের পক্ষে গেলেও আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তেলশিল্প, রাজস্ব বণ্টন, জলবায়ুনীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ ভবিষ্যতেও কানাডার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকতে পারে।
সূত্র: এএফপি