শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলা বিক্ষোভে নজর কেড়েছে একটি অদ্ভুত স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আক্ষরিক অর্থে বাক্যাংশটির সুস্পষ্ট কোনো বার্তা নেই। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, পুলিশের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ এবং বর্ণগত পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে ধরতেই তাঁরা এটি ব্যবহার করছেন।
স্লোগানটির তাৎপর্য বুঝতে হলে এর ভাষাগত গঠন ও বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হবে। আরবি ও ফরাসি ভাষার শব্দের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথ্যভঙ্গির মিশ্রণে তৈরি বাক্যাংশটি এখন ফরাসি বিক্ষোভের একটি আলোচিত বিষয়। এর মধ্য দিয়ে পুলিশের কথিত নজরদারি কৌশল এবং আরব ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। মুসলমানরা সাধারণত কোনো কাজ শুরুর আগে শব্দটি ব্যবহার করেন। ফরাসি কথ্যভাষায় শব্দটি কখনো কখনো ‘চলো, শুরু করা যাক’—এমন অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ বলতে অন্ধকার বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি বোঝানো হয়। শব্দ দুটির আক্ষরিক অর্থ একত্র করলে দাঁড়ায়—‘আল্লাহর নামে, অন্ধকার’ কিংবা ভাবানুবাদে ‘চলো শুরু করা যাক, পরিস্থিতি অন্ধকার’। তবে স্লোগানটির প্রকৃত তাৎপর্য কেবল শব্দের অর্থে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া।
স্লোগানের সূত্রপাত যেভাবে
বিক্ষোভের মধ্যে স্লোগানটি আলোচনায় আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট থেকে। চলতি মাসের শুরুতে স্ন্যাপচ্যাটে ছড়িয়ে পড়া ওই কথোপকথনে একটি গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ দেখা যায়। মামাদু নামের এক ব্যবহারকারীর পরিচয়ে পাঠানো বার্তাটিতে লেখা ছিল, ‘হাই, ইন দ্য নেম অব গড, ইটস দ্য ডার্কনেস। হোয়েনস দ্য ব্লকেড, ওয়াল্লাহ, ব্রো?’
বার্তাটিতে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও ছিল। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাঁদের আন্দোলনসংক্রান্ত গ্রুপ চ্যাটে প্রবেশের উদ্দেশ্যে পুলিশ কর্মকর্তারাই এমন বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, আরবি শব্দ, ফরাসি ও ইংরেজি অভিব্যক্তি এবং অনানুষ্ঠানিক স্ল্যাংয়ের অস্বাভাবিক মিশ্রণ বার্তাটিকে অবিশ্বাস্য করে তুলেছিল। ফলে এটি পুলিশের কথিত ছদ্মবেশী নজরদারির প্রচেষ্টা নিয়ে বিদ্রূপের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
তবে শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। ফরাসি কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। ফলে কথোপকথনটির পেছনে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তারপরও ঘটনাটি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে পুলিশের নজরদারি ও আচরণ নিয়ে বিদ্যমান সন্দেহকে সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের একাংশের কাছে স্লোগানটি এখন কেবল একটি অদ্ভুত বাক্যাংশ নয়; বরং পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশের প্রতীক।
বর্ণগত পক্ষপাতের অভিযোগ
ফ্রান্সে পুলিশের আচরণ, পরিচয় যাচাই এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে আরব ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণদের প্রতি পুলিশের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বৈষম্য ও অতিরিক্ত নজরদারির অভিযোগ উঠেছে।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের প্রমাণের পরিবর্তে ব্যক্তির গায়ের রং, বংশপরিচয় কিংবা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সন্দেহ করা হয়। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক গ্রুপ চ্যাটের ঘটনাটি সেই ধরনের সন্দেহেরই প্রতিফলন—যদিও নির্দিষ্ট অভিযোগটির সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস ৮-এর আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ইউসুফ এল চাজলি মনে করেন, এই বাক্যাংশ পুলিশের একটি গৎবাঁধা ভাবমূর্তিকে আরও জোরালো করে। তাঁর মতে, আরব ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণদের লক্ষ্য করে পুলিশের প্রচলিত কৌশল সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে, স্লোগানটি সেই ধারণাকেই বিদ্রূপের মাধ্যমে তুলে ধরছে। চলমান আন্দোলনে এ ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের প্রশ্নও সামনে আনছে।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ এবং আলোচিত গ্রুপ চ্যাটে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা—দুটি পৃথক বিষয়। প্রথমটি নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে; দ্বিতীয়টির সত্যতা নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তাই স্লোগানটির রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মূল দাবি ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নত করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্ক, নজরদারির অভিযোগ এবং বর্ণগত বৈষম্যের প্রশ্ন আন্দোলনের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটির গুরুত্বও এখানেই। এর আক্ষরিক অর্থ অস্পষ্ট হলেও, এটি পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি ব্যঙ্গাত্মক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়ায় ঘটনাটিকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা জরুরি।