প্লাস্টিকের বিকল্পে পরিবেশবান্ধব শিল্পে নতুন সম্ভাবনা, কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন স্থানীয় নারী-পুরুষ
প্লাস্টিক ও থার্মোকলের একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) পণ্যের পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশেও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে সরকারি উদ্যোগ, সচেতনতা এবং বাজারের চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধায় গড়ে উঠেছে একটি সম্ভাবনাময় কাগজের প্লেট (পেপার প্লেট) উৎপাদন শিল্প, যা ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে জায়গা করে নিয়েছে।
স্বল্প মূল্যে মানসম্মত, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় গাইবান্ধায় তৈরি এসব কাগজের প্লেট এখন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, মিলাদ, পিকনিক, করপোরেট অনুষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান ও ফাস্টফুড দোকানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ছোট পরিসরের একটি উদ্যোগ ধীরে ধীরে স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনায় রূপ নিচ্ছে।
পরিবেশ রক্ষার চিন্তা থেকেই উদ্যোগ
গাইবান্ধা পৌরসভার আদর্শপাড়ার একটি ছোট্ট কারখানায় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ততা লেগেই থাকে। বড় শিল্পকারখানার মতো বিশাল যন্ত্রপাতি বা শত শত শ্রমিক নেই। কয়েকটি আধুনিক প্রেস মেশিন আর অল্পসংখ্যক দক্ষ কর্মীর হাতেই প্রতিদিন হাজার হাজার কাগজের প্লেট তৈরি হচ্ছে।
এই উদ্যোগের উদ্যোক্তা রেজাউন্নবী রাজু। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এমন একটি পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করছিলেন, যা একদিকে পরিবেশবান্ধব হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও থাকবে। তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিকের ব্যবহার যত বাড়ছে, পরিবেশের ক্ষতিও তত বাড়ছে। আমরা এমন একটি বিকল্প দিতে চাই, যা ব্যবহার শেষে সহজেই নষ্ট হয়ে যাবে এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। একই সঙ্গে দামও যেন সবার নাগালের মধ্যে থাকে।’

মানসম্মত কাঁচামাল, আধুনিক উৎপাদন
কারখানাটিতে উন্নতমানের জিএসএম বোর্ড পেপার ও ফুড-গ্রেড লেমিনেশন ব্যবহার করে বিভিন্ন আকারের প্রিন্টেড ও সিলভার লেমিনেটেড প্লেট তৈরি করা হচ্ছে। এসব প্লেটে গরম ভাত, বিরিয়ানি, মাংস, মাছ, তরকারি, তেলযুক্ত কিংবা তরল খাবার পরিবেশন করলেও সহজে নরম হয় না বা খাবার চুইয়ে পড়ে না। খাবারের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম।
উৎপাদিত প্লেটগুলো বিভিন্ন সাইজে তৈরি হওয়ায় অনুষ্ঠানভেদে ব্যবহার করা যায়। পাইকারি বিক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ ডিজাইন ও কাস্টম প্রিন্টও করা হচ্ছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ
উদ্যোক্তা জানান, বর্তমানে গাইবান্ধার এই কারখানায় উৎপাদিত প্লেট ঢাকাসহ রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার প্লেট তৈরি হলেও অনেক সময় অর্ডার অনুযায়ী সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ
এই ক্ষুদ্র শিল্প শুধু পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। কারখানাটিতে কয়েকজন নারী ও যুবক নিয়মিত কাজ করছেন। বিশেষ করে স্থানীয় নারীরা প্লেট বাছাই, প্যাকেজিং, গুণগত মান যাচাই ও প্রস্তুতকরণের কাজে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয় বাড়াতে সহায়তা করছেন। এক নারী কর্মী বলেন, ‘আগে সংসারের কাজই করতাম। এখন এখানে কাজ করে নিজের আয় হচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও কিছুটা বহন করতে পারছি।’
প্লাস্টিকের বিকল্পে বাড়ছে বাজার
বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও পরিবেশ অধিদপ্তর ধাপে ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, কাগজের প্লেট, কাঠের চামচ, বাঁশের স্ট্র, পাটজাত পণ্য ও অন্যান্য জৈব উপকরণের ব্যবহার বাড়ানো গেলে প্লাস্টিক দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। এই বাস্তবতায় গাইবান্ধার পেপার প্লেট শিল্প সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
উদ্যোক্তা রেজাউন্নবী রাজু জানান, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণ পেতে জটিলতা, উন্নত যন্ত্রপাতির উচ্চ মূল্য এবং বিদ্যুৎ ব্যয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। তখন শুধু দেশের বাজার নয়, ভবিষ্যতে বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গাইবান্ধার মতো জেলায় এ ধরনের ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে ওঠায় স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নতুন উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হচ্ছেন, কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের একটি নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে যদি জেলা পর্যায়ে এ ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিবেশবান্ধব শিল্প আরও গড়ে ওঠে, তবে একদিকে যেমন প্লাস্টিক নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে টেকসই শিল্পায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
সম্ভাবনার প্রতীক
গাইবান্ধার আদর্শপাড়ার ছোট্ট এই কারখানা আজ শুধু কাগজের প্লেট তৈরি করছে না; এটি পরিবেশবান্ধব শিল্প, স্থানীয় উদ্যোক্তার সাফল্য, নারীর কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিদিন এই কারখানা থেকে বের হওয়া প্রতিটি পেপার প্লেট যেন একটি বার্তাই বহন করছে—পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একসঙ্গে সম্ভব, যদি থাকে উদ্ভাবনী চিন্তা, উদ্যোগ এবং সঠিক সহায়তা।