হেপাটাইটিসকে চিকিৎসকরা বলেন ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন বুঝতে পারেন না যে তিনি ভাইরাস বহন করছেন। কিন্তু এই ভাইরাস ধীরে ধীরে লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে সিরোসিস, লিভার বিকল এবং লিভার ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের কারণ হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গর্ভাবস্থায় মা আক্রান্ত হলে নবজাতকের শরীরেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে রংপুর বিভাগের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ গর্ভবতী নারী, প্রসূতি, দাই এবং সাধারণ মানুষের হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। অনেকেই জানেন না, রক্ত, অনিরাপদ চিকিৎসা সরঞ্জাম, একই ব্লেড বারবার ব্যবহার কিংবা মা থেকে সন্তানের শরীরেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বাসিন্দা ফারজানা আক্তারের এক মাস বয়সী ছেলে জন্মের দুই দিনের মাথায় জন্ডিসে আক্রান্ত হয়। তিনি বলেন, “গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়েছি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করেছি। কিন্তু হেপাটাইটিস পরীক্ষা বা এ বিষয়ে আলাদা কোনো পরামর্শ পাইনি। সন্তান অসুস্থ হওয়ার পরই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারি।”
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার আজিনা বেগম বলেন, “হেপাটাইটিস কীভাবে ছড়ায়, তা আগে জানতাম না। গ্রামের অনেক নারীই এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।”
শুধু সাধারণ মানুষ নন, গ্রামে প্রসব করানো অনেক দাইয়ের কাছেও হেপাটাইটিস এখনো অচেনা। গাইবান্ধার এক দাই রাবেয়া বেগম বলেন, “৪০ বছর ধরে প্রসব করাই, কিন্তু হেপাটাইটিস নিয়ে কখনও কোনো প্রশিক্ষণ পাইনি।”
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. জিয়া হায়দার বসুনিয়া বলেন,
“গর্ভাবস্থায় যদি মা হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে নবজাতকের সংক্রমণের ঝুঁকি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং জন্মের পরপরই টিকা দিলে এই ঝুঁকি ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “প্রত্যেক নারীকে গর্ভধারণের আগে বা অন্তত গর্ভাবস্থায় একবার হেপাটাইটিস ‘বি’ পরীক্ষা করানো উচিত। এটি বাধ্যতামূলক করা গেলে বহু শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।”
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সায়েম বলেন,
“অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর মাধ্যমে স্ত্রী সংক্রমিত হন। একই ব্লেড বারবার ব্যবহার, অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং জীবাণুমুক্ত নয় এমন চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণেও হেপাটাইটিস ছড়ায়। পরে মায়ের শরীর থেকে গর্ভের সন্তানও আক্রান্ত হতে পারে।”
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. কামরুজ্জামান ইবনে তাজ বলেন,
“ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের যে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেওয়া হয়, তার মধ্যেই হেপাটাইটিস ‘বি’-এর প্রতিষেধক রয়েছে। কিন্তু অনেক অভিভাবকই বিষয়টি জানেন না। সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।”
গাইবান্ধা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. হারুন অর রশিদ বলেন,
“হেপাটাইটিস মারাত্মক সংক্রামক রোগ হলেও এটি নিয়ে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি খুবই সীমিত। ফলে অনেক রোগী দেরিতে শনাক্ত হন।”
পরিসংখ্যান নেই, উদ্বেগ আছে
রংপুর বিভাগের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কার্যালয়ে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানেই নিয়মিত তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। রংপুর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১ হাজার ১৮৬ জনের পরীক্ষা করে ছয়জন গর্ভবতী নারী হেপাটাইটিস ‘বি’ পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, কারণ অধিকাংশ মানুষ কখনও পরীক্ষাই করান না।
দেশে এক কোটি আক্রান্ত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। বেসরকারি হিসাবে প্রতিবছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ এই রোগজনিত জটিলতায় মারা যান। আক্রান্তদের ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই জানেন না যে তারা এই ভাইরাস বহন করছেন।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত হেপাটাইটিস পরীক্ষা, নিরাপদ রক্ত গ্রহণ, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার, একবার ব্যবহারযোগ্য ব্লেড ব্যবহার, নিরাপদ প্রসব এবং জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণের বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হেপাটাইটিসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র চিকিৎসা নয়, বরং আগাম শনাক্তকরণ, টিকাদান এবং জনসচেতনতা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, গর্ভবতী নারীদের স্ক্রিনিং এবং দাই ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো গেলে মা ও নবজাতকের জীবনরক্ষা অনেকটাই নিশ্চিত করা সম্ভব।