দখলের থাবায় রেলের ২১.৪৮ একরের জলাশয়, কোটি টাকার রাজস্ব গচ্চা

রূপম ভট্টাচার্য্য, চট্টগ্রাম ব্যুরো
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত ২১ দশমিক ৪৮ একর আয়তনের একটি বিশাল জলাশয় দীর্ঘদিন ধরে দখলের কবলে রয়েছে। এস্টেট ও আইন শাখার দুর্বল ভূমিকার কারণে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব গচ্চা যাচ্ছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইনগত জটিলতার অজুহাতে জলাশয়টি নতুন করে ইজারা দেওয়া না হলেও এর পাড় দখল করে হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদে এস্টেট শাখার রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার পেছনে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মাছ চাষের জন্য জলাশয়টির লাইসেন্স গ্রহণ করেন আব্দুল লতিফ। ২১.৪৮ একর আয়তনের জলাশয়টি পাঁচ বছরের জন্য মোট ২১ লাখ ৮১ হাজার ৪০০ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। বাংলা সন অনুযায়ী ইজারার মেয়াদ ছিল ১৪২২ সালের শুরু থেকে ১৪২৬ সালের শেষ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল ২০১৫ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত।

ইজারার শর্তে উল্লেখ ছিল, জলাশয়টি শুধুমাত্র মাছ চাষের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এর কোনো অংশে স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এছাড়া মাটি খনন, পানি অন্যত্র ব্যবহার বা জমির প্রকৃতি পরিবর্তনও নিষিদ্ধ ছিল।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে জলাশয়ের পাড়ে হাজারের বেশি কাঁচা, আধাপাকা ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে সেগুলো ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব স্থাপনায় অবৈধভাবে রেলওয়ের বিদ্যুৎও ব্যবহার করা হচ্ছে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার শর্ত থাকলেও বর্তমানে এমনভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, যা অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এতসব অনিয়মের পরও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। শুধু তাই নয়, ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন করে লাইসেন্স প্রদানের কার্যক্রম গ্রহণ করেনি এস্টেট শাখা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

এদিকে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বরের আগে তৎকালীন বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) দীপঙ্কর তঞ্চঙ্গ্যা আব্দুল লতিফকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। নোটিশে বলা হয়, ১৪২৭ থেকে ১৪৩০ অর্থবছর এবং ১৪৩১ চলমান বছরের লাইসেন্স ফি, ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ৫২ লাখ ৬ হাজার ৭০ টাকা বকেয়া রয়েছে।

নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২০-এর ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইজারার শর্ত ভঙ্গ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে কেন তাঁর লাইসেন্স বাতিল ও সরকারি পাওনা আদায় আইন, ১৯১৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—তার ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।

জবাবে আব্দুল লতিফ দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট জলাশয় বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে তাঁর কোনো চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়নি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে বকেয়া দাবি করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তিনি আরও বলেন, তিনি ১৪২৭ থেকে ১৪৩১ অর্থবছরের লাইসেন্সধারী নন। ফলে ওই সময়ের লাইসেন্স ফি দাবি করা এবং ইজারার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ আনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে জলাশয়টি দখল করে রাখা হয়েছে। ইজারা না থাকলেও প্রতি বছর জলাশয় থেকে কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি জলাশয়ের পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া এত বড় সরকারি সম্পত্তি দীর্ঘদিন দখলে রাখা সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা সম্ভব হলেও তা করা হয়নি।

তবে আব্দুল লতিফ নিজেকে লাইসেন্সধারী নন বলে দাবি করলেও আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করে রেলওয়ের পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, মামলাজনিত জটিলতার কারণে নতুন করে ইজারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে অবৈধ স্থাপনার বিষয়ে কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা না করায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারী জানান, যারা জমি দখল করে আছে তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গেলে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে কেউ ঝুঁকি নিতে চান না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, "বিষয়টি আমি সম্প্রতি জেনেছি। আদালতে মামলা থাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদ বলেন, "এই দিঘি নিয়ে আব্দুল লতিফ বনাম বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে গত বছরের ৮ মে প্যানেল আইনজীবীর কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো জবাব পাওয়া যায়নি। চিঠির জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

বিষয়:

চট্টগ্রাম
এলাকার খবর

সম্পর্কিত