দুই বছরেও হদিস নেই পুলিশের লুট হওয়া ১,৩২৬ অস্ত্র

কম দামে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র পাচ্ছে কোথায়

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৮
 ছবি:

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সহিংসতার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোতে আবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরেছে। কিন্তু সেই দিনের একটি বড় ক্ষত এখনো পুরোপুরি সারেনি। দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৬টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রের অবস্থান কোথায়, কার হাতে রয়েছে কিংবা এর কোনোটি অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নেরও পূর্ণাঙ্গ উত্তর নেই।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট দেশের ৪৬০টি পুলিশ স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৮২৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে সাবমেশিনগান, এসএমজি, চায়না রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। পরে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। তবে এখনো ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১২৫টি গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুলসংখ্যক সরকারি অস্ত্র গেল কোথায়? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধী চক্রের হাতে চলে গিয়ে থাকতে পারে। কোনো কোনো অস্ত্র হাতবদল হয়ে অবৈধ বাজারে বিক্রি হওয়ার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে এসেছে। ফলে এসব অস্ত্র ভবিষ্যতে সংঘবদ্ধ অপরাধ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহদাত হোসাইন বলেন, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। যেগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো উদ্ধারে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান চলছে।

তবে শুধু অভিযান চালানোর কথা বললেই প্রশ্নের অবসান হচ্ছে না। দুই বছর পরও এক হাজারের বেশি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে থাকলে তা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। দ্রুত এসব অস্ত্র উদ্ধার করা না হলে ভবিষ্যতে সেগুলোর অপব্যবহারের আশঙ্কা আরও বাড়বে।

শুধু আশঙ্কা নয়, লুট হওয়া অস্ত্র বা গোলাবারুদ অপরাধে ব্যবহারের কিছু নজিরও সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে সংঘর্ষের একটি ঘটনায় পরবর্তী সময়ে একটি অপরাধী আস্তানা থেকে থানা থেকে লুট হওয়া গুলি ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। পরে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকেও উদ্ধার হওয়া কার্তুজ থানা থেকে লুট হওয়া গোলাবারুদের বলে নিশ্চিত করে পুলিশ।

চট্টগ্রামে আরেক ঘটনায় ডাবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া একটি সার্ভিস পিস্তল হাতবদল হয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য তদন্তে উঠে আসে। পরে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের ঘটনা দেখাচ্ছে, লুট হওয়া অস্ত্র শুধু কোনো গোপন স্থানে পড়ে নেই; কিছু অস্ত্র অন্তত হাতবদল হয়ে অপরাধীদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার পল্লবী এলাকায় একটি অপরাধী চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি পিস্তলের ক্ষেত্রেও তদন্তে দেখা যায়, সেটি একসময় থানায় জমা দেওয়া বৈধ ব্যক্তিগত অস্ত্র ছিল এবং ৫ আগস্টের থানা লুটের সময় সেটিও খোয়া যায়। অর্থাৎ পুলিশের সরকারি অস্ত্রের পাশাপাশি ওই সময় থানায় থাকা ব্যক্তিগত বৈধ অস্ত্রও অপরাধীদের হাতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ যদি অপরাধী চক্রের কাছে থেকে থাকে, তাহলে তা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি থেকেই যাবে। বিশেষ করে অস্ত্রগুলো একাধিকবার হাতবদল হলে মূল উৎসে ফিরে গিয়ে সেগুলো উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করা জরুরি। তাঁর মতে, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের পাশাপাশি খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও পুলিশের ওপর হামলার পেছনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভও কাজ করেছে। তাঁর মতে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুলিশকে জবাবদিহিমূলক, নিরপেক্ষ ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা জরুরি।

অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি তদন্তকারীদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে ৫ আগস্টের হামলায় ধ্বংস হওয়া নথি ও আলামত নিয়ে। রাজধানীর ছয়টি থানায় পুড়ে যায় ১ হাজার ২২৬টি মামলার নথি। শুধু মিরপুর মডেল থানাতেই ৬৬০টি মামলার ফাইল এবং মালখানায় থাকা ২৩০টি আলামত ধ্বংস হয়। যাত্রাবাড়ী থানায় পুড়ে যাওয়া নথি ও জব্দ করা আলামতের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও এখনো শেষ হয়নি। এসব নথি ও আলামত নষ্ট হওয়ায় অনেক মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে।

ওই সময়ের সহিংসতায় পুলিশ সদস্যদের প্রাণহানিও ঘটে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানাতেই নিহত হন ১৫ জন। পুলিশ সদস্য হত্যা, থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। কিন্তু অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি এসব মামলার তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতিও এখনো জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে এখন সাধারণ অভিযানের পাশাপাশি **অস্ত্রের গতিপথ শনাক্তকরণে বিশেষ গোয়েন্দা অভিযান** প্রয়োজন। কোন থানা থেকে কোন অস্ত্র খোয়া গেছে, তার সিরিয়াল নম্বর ও ব্যালিস্টিক তথ্য কোথায় কোথায় পাওয়া গেছে, কোন অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে তা মিলে যাচ্ছে—এসব তথ্য একত্র করে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস তৈরি করা দরকার।

একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং অস্ত্রের ক্রেতা-বিক্রেতা ও মধ্যস্থতাকারীদের শনাক্ত করাও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা। কারণ কোনো অস্ত্র একবার অপরাধী চক্রের হাতে গিয়ে একাধিকবার হাতবদল হলে শুধু থানাভিত্তিক অভিযান চালিয়ে সেটি উদ্ধার করা কঠিন।

পুলিশ বলছে, অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা থেমে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু দুই বছর পরও ১ হাজার ৩২৬টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্রের হদিস না মেলায় সেই অভিযান কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। কারণ একটি রাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্র শুধু পুলিশের সম্পদ হারানোর ঘটনা নয়; এসব অস্ত্র ভবিষ্যতের অপরাধের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় লুট হওয়া অস্ত্র বা গোলাবারুদ অপরাধস্থল কিংবা অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধারের নজির পাওয়া গেছে।

তাই প্রশ্নটি শুধু ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্র কোথায়—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। এসব অস্ত্রের কতগুলো ধ্বংস হয়েছে, কতগুলো কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে, কতগুলো হাতবদল হয়েছে এবং কতগুলো ইতিমধ্যে অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এবং প্রতিটি অস্ত্রের হিসাব উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ৫ আগস্টের সেই লুটের ক্ষত পুরোপুরি মুছে যাবে না।
 

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে: রয়টার্স

আন্দোলন জোরদারের সিদ্ধান্ত ১১ দলের

শিশুদের আসক্তি ও তথ্য চুরির মামলায় ১ হাজার ৬৬৮ কোটি ডলারে মেটার আপস

ক্যান্সারের ইনজেকশনে পানি, সরকারি স্কিমের ওষুধ কালোবাজারে: ভারতে চক্রের সন্ধান

নেপাল–তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা, কারণ কি হিমবাহের বরফধস?

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটিতে শিক্ষাই হোক চালিকাশক্তি

সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে ‘ব্যর্থ’, বিরোধীদের মন্তব্য ঢালাও: রিজভী

কক্সবাজারে সাগরে গোসলে নেমে পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ১

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

১০

অসচ্ছল পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে: আমিনুল হক

১১

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে মোদির শুভেচ্ছা

১২

সার নিয়ে আতঙ্ক দূর করতে পরিপত্র, দায়িত্বে থাকা ডিলাররাই সার বিক্রি করবেন: প্রতিমন্ত্রী

১৩

সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটি গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: চিফ হুইপ

১৪

রাতারাতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৫

যুক্তরাষ্ট্রের ৭০০ পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করল কানাডা

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৩

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত