দুই বছর ধরে একই প্রশ্ন নিয়ে ঘুরছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গাজী টায়ারসের অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ১৮২ জনের স্বজনেরা—তাঁদের মানুষগুলো কি আর বেঁচে নেই? যদি না থাকেন, তবে অন্তত একটি সরকারি স্বীকৃতি কেন মিলছে না? নিখোঁজদের খোঁজে থানা-পুলিশ, জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের দরজায় ঘুরেও কোনো পরিবার নিশ্চিত উত্তর পায়নি। এখন আর তাঁদের প্রত্যাশা স্বজন ফিরে আসবেন—এমন নয়। কেউ চান একটি হাড়ের টুকরো, কেউ চান ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা, কেউবা চান শুধু একটি মৃত্যুসনদ। কারণ সেই একটি কাগজের অভাবে আটকে আছে তাঁদের সন্তানের জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা এবং মৃত ব্যক্তির নামে থাকা ঋণের হিসাব।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট রাতে গাজী টায়ারস কারখানায় দ্বিতীয় দফা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর নিখোঁজ হন এসব মানুষ। পরদিন কারখানার সামনে স্বজনেরা জড়ো হয়ে জানান, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা কারখানার ভেতরে গিয়েছিলেন, কিন্তু আর ফিরে আসেননি। জেলা প্রশাসন তখন ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নিয়ে ১৮২ জনের একটি নিখোঁজ তালিকা তৈরি করে। দুই বছর পরও সেই তালিকার কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে থাকা তালিকা ধরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, তাঁরা আগুনে মারা গেছেন।
কিন্তু ধারণা আর সরকারি স্বীকৃতির মধ্যে যে বড় ফারাক, তার মাশুল দিতে হচ্ছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারকে।
রূপগঞ্জের মৈকুলী এলাকার ইলেকট্রিক মিস্ত্রি শাহাদাত শিকদার, তাঁর ভাই সাব্বির শিকদার ও বোনের স্বামী জমির আলী—এই তিনজনই গাজী টায়ারসের আগুনের পর নিখোঁজ হন। তাঁদের বোন সিনথিয়া আক্তার গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটেছেন। এখন তিনি আর ভাইদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় নেই।
সিনথিয়ার কথায়, “এত দিনেও যখন তারা কেউ ফেরেনি, আমরা বুঝতে পারতেছি যে, তারা আর বেঁচে নেই। কিন্তু মৃত্যুসনদ না থাকায় জন্মনিবন্ধন বা ওয়ারিশ সনদ কিছুই করাতে পারতেছি না।”
শাহাদাত নিখোঁজ হওয়ার প্রায় তিন মাস পর তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহর জন্ম হয়। শিশুটির বয়স এখন প্রায় দুই বছর, কিন্তু পরিবারের সদস্যরা এখনো তার জন্মনিবন্ধন করতে পারেননি। কারণ সরকারি নথিতে শিশুটির বাবার পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
শুধু জন্মনিবন্ধন নয়, শাহাদাতের নামে থাকা কিস্তির ঋণও পরিবারটির জন্য বোঝা হয়ে আছে। সিনথিয়া বলেন, “ভাইয়ের নামে কিস্তির টাকা ছিল, মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় তাও মাফ হইতেছে না। রোজ এ নিয়ে কিস্তির লোকজন আইসা কথা শোনায়।”
তাঁর নিজের জীবনও বদলে গেছে। পরিবারের দুই উপার্জনক্ষম ভাই ও বোনের স্বামীকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছে তাঁর ওপর। জীবিকা চালাতে স্থানীয় একটি সাবান কারখানায় চাকরি নিয়েছেন তিনি।
নিখোঁজ মো. আরিফের স্ত্রী ফারজানার অবস্থাও একই। ২৭ বছর বয়সী আরিফ একটি টেক্সটাইল মিলে কাজ করতেন। তাঁকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ফারজানা এখন মায়ের বাড়িতে থাকেন। বাড়িভাড়া জমে যাওয়ায় আগের বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে। বড় ছেলের পড়াশোনাও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি আগের স্কুলে।
ফারজানার ভাষায়, “দিন যাইতাছে সবার ঠিকমতই, কিন্তু আমাদের জীবনডা তো থাইমা আছে।”
ব্যাটারি কারখানার শ্রমিক আমান উল্লাহর বৃদ্ধা মা রাশিদা বেগম এখনো ছেলের অপেক্ষায় থাকেন। কয়েক দিন পরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কিংবা থানায় যান। কখনো গাজী টায়ারসের কারখানার সামনেও দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়। “আমারে যদি পোলাডার হাড়গোড়ও দিতো। বুকে চাইপা ধইরা দুঃখ ভুইল্লা যাইতাম। আমার বাপধনের পোড়া ছাইটাও তো পাইলাম না”—কাঁদতে কাঁদতে বলেন তিনি।
ট্রাকচালক নূর হোসেন নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী পারভীন বেগমকে দুই সন্তান ও এক মেয়েকে নিয়ে আগের বাসা ছেড়ে ছোট একটি টিনশেড ঘরে উঠতে হয়েছে। তাঁর কথায়, স্বামী যে মারা গেছেন—সরকারিভাবে সেটি ঘোষণা করলেও তিনি অন্তত বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু নিখোঁজ থাকার কারণে সেই সুযোগও নেই।
গাজী টায়ারসের ওই ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট রাতে। তার আগে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারখানাটিতে প্রথম দফায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত কারখানায় লুটপাট চলে। পরে ভবনটির বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ ছিল।
এরপর ২৫ আগস্ট রাতে দ্বিতীয় দফায় লুটপাটের সময় কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। ভবনের ভেতরে তামা ও রাসায়নিক পদার্থ লুট করতে গিয়ে একদল মানুষ নিচতলার গেট বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট প্রায় ২২ ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পুরোপুরি আগুন নেভাতে সময় লাগে পাঁচ দিন। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। আগুন নেভানোর পর বেজমেন্টে ফায়ার সার্ভিস একটি প্রাথমিক অভিযান চালালেও সেখানে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি।
এরপর শুরু হয় নিখোঁজের হিসাব। ২৬ আগস্ট কারখানার সামনে স্বজনেরা জড়ো হলে প্রশাসন তাঁদের কাছ থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করে। তৈরি হয় ১৮২ জনের তালিকা।
সরকারি তদন্তও হয়। ২৭ আগস্ট তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ১২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্টের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিলে পরবর্তী সময়ে এত বড় অগ্নিকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
কিন্তু নিখোঁজদের ভাগ্যে সেই তদন্তও নিশ্চিত কোনো উত্তর নিয়ে আসেনি।
ঘটনার কয়েক দিন পর, ১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কারখানার সামনে গণশুনানি হয়। সেখানে ৮০টি নিখোঁজ পরিবারের সদস্য অংশ নেন। শুনানি শেষে স্বজনদের কেউ কেউ বাধা উপেক্ষা করে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ঢুকে পড়েন। সেখান থেকে তাঁরা ১৫ খণ্ড হাড় উদ্ধার করেন। পরে সেগুলো পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়।
তখন বলা হয়েছিল, হাড়গুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে পাঠানো হবে। কিন্তু দুই বছর পরও সেই পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়নি।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, উদ্ধার হওয়া হাড় এখনো সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা করলে সেগুলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না থাকায় পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হয়নি।
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে। ১৮২ জন নিখোঁজ। তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, তাঁরা মারা গেছেন। আবার কারখানা থেকে মানুষের হাড়ও উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু সেই হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কাজটি দুই বছরেও শেষ হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, কয়েকটি নিখোঁজ পরিবারের সদস্য সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিয়ে আপডেট দেওয়া হবে। সরকারি কাগজপত্র তৈরিতে কোনো জটিলতা হলে পরিবারগুলোকে সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে গাজী টায়ারস কর্তৃপক্ষ লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় দুটি মামলা করেছিল। কিন্তু ওই মামলাগুলোতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই। রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, মামলা দুটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে নিখোঁজ ১৮২ জনের বিষয়ে ওই মামলায় কিছু নেই।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ওই সময় পুলিশ বাদী হয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে মামলা করতে পারত। কিন্তু কেন তা করা হয়নি, সেটি তখনকার দায়িত্বশীলরা বলতে পারবেন। পরে নিখোঁজদের তালিকা ধরে পুলিশ তাঁদের সন্ধানের চেষ্টা করেছে, কাউকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদনও পাঠানো হয়েছে।
স্বজনেরা অবশ্য বলছেন, তখনকার পরিস্থিতিই তাঁদের মামলা করতে দেয়নি। তাঁদের কেউ কেউ জানিয়েছিলেন, ‘লুটপাট করতে গিয়ে মারা গেছে’ কিংবা মামলা করলে আরও ঝামেলায় পড়তে হবে—এমন ভয় দেখানো হয়েছিল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর কয়েকটি পরিবার সাধারণ ডায়েরি করেছিল।
দুই বছর পর এখন পরিবারগুলোর চাওয়া তাই বদলে গেছে। কেউ আর রাষ্ট্রের কাছে অলৌকিকভাবে নিখোঁজ স্বজনকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করছেন না। তাঁরা চান, অন্তত অনুসন্ধানটি শেষ হোক। কারখানা থেকে উদ্ধার হওয়া হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা হোক। নিখোঁজদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হোক। আর যদি তাঁরা সত্যিই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে রাষ্ট্র যেন সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে।
কারণ একটি পরিবারের কাছে মৃত্যু শুধু একজন মানুষকে হারানোর ঘটনা নয়; মৃত্যুর স্বীকৃতি না থাকলে সেই শোকও যেন সম্পূর্ণ হয় না। আর গাজী টায়ারসের ১৮২টি পরিবারের ক্ষেত্রে দুই বছর ধরে সেই অসমাপ্ত শোকই বয়ে চলেছে। এখন তাঁদের চাওয়া খুব ছোট—স্বজনের দেহ না হোক, অন্তত সত্যটা জানতে চান। আর সত্য যদি হয় মৃত্যু, তবে একটি মৃত্যুসনদ চান। বিডিনিউজ