লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা সীমান্তে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে এক যুবককে মারধর করে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যদের বিরুদ্ধে। তবে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে প্রতিরোধ করলে দুই বিএসএফ সদস্য অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ফেলে সীমান্তের ওপারে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পরে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিএসএফের দুটি শটগান ও একটি ওয়াকিটকি বিজিবির কাছে হস্তান্তর করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনাটি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের পর উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও ওয়াকিটকি বিএসএফের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
মঙ্গলবার দুপুরে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের বনচৌকি আমঝোল সীমান্তের ৯০৭/৪-এস মেইন পিলারের কাছে এ ঘটনা ঘটে বলে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী যুবকের নাম লিটন মিয়া। তাঁর বয়স ২৮ বছর। তিনি জানান, ঘটনার সময় তাঁর বাবা সীমান্তসংলগ্ন একটি ক্ষেতে কাজ করছিলেন। তাঁর মা বাবার জন্য খাবার নিয়ে সেখানে যান। এ সময় বিএসএফের সদস্যরা তাঁদের দিকে এগিয়ে আসেন।
লিটনের ভাষ্য, তিনি তাঁর মাকে সরে যেতে বলেছিলেন। এর পরপরই বিএসএফের দুজন সদস্য বাংলাদেশের সীমার ভেতরে ঢুকে তাঁকে মারধর শুরু করেন এবং জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
লিটন বলেন, তিনি তখন চিৎকার শুরু করলে আশপাশের ধানখেত ও গ্রামের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয় লোকজন বিএসএফ সদস্যদের বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন বলে লিটন জানিয়েছেন। এ সময় তাঁরা তাঁদের দুটি শটগান ও একটি ওয়াকিটকি ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে সীমান্তের ওপারে চলে যান।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই অস্ত্র ও ওয়াকিটকি উদ্ধার করে বিজিবির বনচৌকি ক্যাম্পে জমা দেন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষজনের মধ্যে আতঙ্কও দেখা দেয়। তবে সন্ধ্যায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, বৈঠকে ঘটনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে উদ্ধার করা দুটি শটগান ও একটি ওয়াকিটকি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনার পর বনচৌকি আমঝোল সীমান্ত এলাকায় কিছুটা থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হলেও পতাকা বৈঠকের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। সীমান্তে বিজিবির নজরদারি ও টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসা করা হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে কোনো নাগরিককে মারধর বা ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর বিষয়।
এ ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে বিএসএফ সদস্যদের অস্ত্র ফেলে যাওয়ার ঘটনা। সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত একটি বাহিনীর সদস্যরা কী পরিস্থিতিতে নিজেদের অস্ত্র ও যোগাযোগের সরঞ্জাম ফেলে পিছু হটলেন, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে পতাকা বৈঠকে এ বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছে বা বিএসএফ তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, সে বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ঘটনার পর বিজিবি সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। স্থানীয়দেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে লিটন মিয়াকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়েও নজর রয়েছে।
সীমান্তের একটি কৃষিজমিতে শুরু হওয়া ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের বৈঠক পর্যন্ত গড়িয়েছে। স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ সদস্যদের অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ফেলে যাওয়ার ঘটনায় সীমান্তজুড়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনার বিষয়ে বিজিবির বক্তব্য ছাড়া বিএসএফের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।