মানবপাচারের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১০টি দেশে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন ৪১ হাজার ২৩১ জন বাংলাদেশি। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া, রাশিয়া ও লাওসে গেছেন সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স (টিআইপি) রিপোর্ট’-এ মানবপাচার প্রতিরোধে দেশগুলোর সরকারের উদ্যোগ ও অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘টিয়ার ২’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মানবপাচার নির্মূলে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও সরকার এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ ঝুঁকির ‘টিয়ার ৩’ শ্রেণিতে থাকা দেশগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী যাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এতে কর্মীদের নিরাপত্তা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যাচাই এবং গন্তব্য দেশের ঝুঁকি মূল্যায়নে সরকারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১০টি দেশে ২১ মাসে গেছেন মোট ৪১ হাজার ২৩১ জন বাংলাদেশি কর্মী।
কম্বোডিয়া, রাশিয়া ও লাওসে বেশি কর্মী
বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে কম্বোডিয়ায় গেছেন ১৫ হাজার ৯৬৩ জন বাংলাদেশি কর্মী। রাশিয়ায় গেছেন ৭ হাজার ৭৫২ জন এবং লাওসে ৭ হাজার ৫৩২ জন। এ ছাড়া কঙ্গোতে ৫ হাজার ৪৩৮ জন, বেলারুশে ৩ হাজার ৪৮৪ জন, সুদানে ৪২১ জন, সোমালিয়ায় ৩৪৩ জন, লিবিয়ায় ১৭২ জন, দক্ষিণ সুদানে ৬৯ জন এবং ইয়েমেনে ৫৭ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন।
টিআইপি প্রতিবেদনে মানবপাচার প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপ, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়। ‘টিয়ার ৩’ শ্রেণিতে থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন হলো, সংশ্লিষ্ট সরকার মানবপাচার নির্মূলের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করছে না এবং তা অর্জনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপও নিচ্ছে না। তবে এ শ্রেণিবিন্যাস কোনো দেশের সব অভিবাসী কর্মী পাচারের শিকার হচ্ছেন—এমন অর্থ বহন করে না।
বাংলাদেশের অগ্রগতি ও ঘাটতি
টিআইপি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের মূল্যায়নকালীন সময়ের তুলনায় মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রচেষ্টা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া জোরদার, অপরাধ ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণের নির্দেশিকা হালনাগাদ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা সেবায় পাঠানোর সমন্বয় বাড়াতে ডিজিটাল ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম) পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অগ্রগতির পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিও চিহ্নিত করেছে প্রতিবেদনটি। আগের মূল্যায়নের তুলনায় বাংলাদেশে কমসংখ্যক মানবপাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। দেশের ভেতরে সংঘটিত মানবপাচার, যৌন শোষণ ও জোরপূর্বক শিশুশ্রমের মতো অপরাধ দমনে পর্যাপ্ত পদক্ষেপের ঘাটতির কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া মানবপাচারের শিকার কমসংখ্যক ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বিদেশ থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বিদেশে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়োগ ফি নেওয়ার সুযোগ বহাল থাকায় তাঁদের অনেককে ঋণগ্রস্ত হতে হয়। এই ঋণ ও আর্থিক নির্ভরতা কর্মীদের শোষণ ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
কম্বোডিয়ায় প্রতারণা, রাশিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে কম্বোডিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের নিয়ে যাওয়ার পর সাইবার প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন ঘটনায় কর্মীদের আটকে রাখা, নির্যাতন এবং অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। জুলাই মাসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, কম্বোডিয়ায় কাজের অনুমতি নিয়ে যাওয়া এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে পড়েছিলেন বলে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে উদ্ধার করে দেশে ফেরানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে রাশিয়ায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশিদের সামরিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ এবং কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব ঘটনা বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তা ও কাজের ধরন যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, শিক্ষার্থী বা পর্যটক ভিসায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি নজরদারি সীমিত হতে পারে। কিন্তু বিএমইটির ছাড়পত্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যেতে পারে না। তিনি বলেন, কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের কাজের পরিবেশ, নিয়োগের শর্ত এবং নিরাপত্তার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে কর্মীরা প্রতারণা বা শোষণের শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। অথচ এজেন্সির অনুমোদন, কার্যক্রমের তদারকি এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সরকারি দায়িত্বের অংশ।
তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্যে কর্মী পাঠানোর আগে দেশভিত্তিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নিয়োগকর্তার পরিচয়, চাকরির প্রকৃতি এবং কর্মপরিবেশ যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই বা কূটনৈতিক সহায়তা সীমিত, সেখানে বিপদে পড়া কর্মীদের উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা আগেই স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশকে নিয়োগ ফি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর নজরদারি বাড়ানো, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাঁদের পর্যাপ্ত আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। মানবপাচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার গন্তব্য দেশগুলোতে কর্মীদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ঘাটতিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়া ৪১ হাজার ২৩১ জন কর্মীর মধ্যে কতজন বর্তমানে চুক্তি অনুযায়ী কাজ করছেন, কতজন প্রতারণা বা শোষণের শিকার হয়েছেন এবং তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সরকারের কাছে কতটা হালনাগাদ তথ্য রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। একই সঙ্গে বিপদে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা দিয়ে এ খাতের সাফল্য বিচার করা যায় না। নিরাপদ অভিবাসন, নিয়োগের স্বচ্ছতা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ ও বেতন নিশ্চিত করা এবং বিপদে পড়া কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা থাকলেই বিদেশে কর্মসংস্থানের সুফল টেকসই হতে পারে।