আরতি, অঞ্জলি ও ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর মন্দির প্রাঙ্গণ, দশমীর বিদায়ঘণ্টায় আনন্দের সঙ্গে বিষাদের ছায়া
নবমীর সন্ধ্যায় আরতি হয়েছে। ঢাকের তালে তালে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের আনাগোনা, প্রার্থনা আর উৎসবের উচ্ছ্বাস। দেবী দুর্গার সামনে কেউ নীরবে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে, কেউ আবার আরতির ছন্দে মগ্ন। তবু আনন্দের এই আবহের আড়ালেই যেন বাজছে বিদায়ের সুর। কারণ, আর আজ বিজয়া দশমীতে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা। তাই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহানবমীর আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বিষাদের অনুভূতিও।
মঙ্গলবার সকালে বিহিত পূজা ও যজ্ঞের মধ্য দিয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সকাল থেকেই মন্দিরে আসতে থাকেন ভক্তরা। পূজা, অঞ্জলি, প্রসাদ গ্রহণ ও দেবীর কাছে প্রার্থনায় দিনভর মুখর ছিল মন্দির প্রাঙ্গণ। ভক্তদের কামনা—অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, মানুষের জীবন ভরে উঠুক সুখ ও সমৃদ্ধিতে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহানবমী দেবী দুর্গার আরাধনার গুরুত্বপূর্ণ তিথি। প্রচলিত বিশ্বাসে, রাবণ বধের আগে এদিনই শ্রীরামচন্দ্র দেবীর পূজা করেছিলেন। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় এদিন বিশেষ পূজা ও যজ্ঞের আয়োজন করা হয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ষোড়শোপচারে পূজা, নবপত্রিকা ও দর্পণ স্নানের মধ্য দিয়ে মাতৃ আরাধনা শুরু হয়। পরে ১০৮টি বেলপাতা, আমকাঠ ও ঘি দিয়ে যজ্ঞের মাধ্যমে দেবীর উদ্দেশে আহুতি দেওয়া হয়। অঞ্জলি শেষে ভক্তদের অনেকে চরণামৃত ও যজ্ঞের ফোঁটা সংগ্রহ করেন।
মন্দিরের সহকারী পুরোহিত সৌম্যদীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, নবমী পূজাকে ‘ভরা পূজা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবী দুর্গার ১৫ কলার সঙ্গে মহাদেবের এক কলা যুক্ত হয়ে তাঁর ১৬ কলা পূর্ণ হয়। মহাদেবের সঙ্গে এই সংযোগ দেবীর আধ্যাত্মিক ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতীক বলে মনে করা হয়। সেই শক্তিতেই বিজয়া দশমীতে দেবী মহিষাসুরকে বধ করবেন—এমন বিশ্বাস রয়েছে ভক্তদের মধ্যে।
মহানবমীর তাৎপর্য তুলে ধরে পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী বলেন, এ পূজার প্রধান লক্ষ্য অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন।
সনাতন ধর্মীয় প্রথায় এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। দেবীর এই যাত্রাকে ঘিরে শস্য-শ্যামল পৃথিবী ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করেন ভক্তরা। তাঁদের প্রার্থনা, পৃথিবীর সব ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হোক, মানুষের জীবনে আসুক সুখ-শান্তি।
আনন্দের আড়ালে বিদায়ের বিষাদ
মহানবমীর পূজা ও আরতির আয়োজনের মধ্যেও অনেক ভক্তের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল বিদায়ের ভাবনা। দুর্গোৎসবের দিনগুলো যেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আর এক দিন পরই প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের উৎসব। এই উপলব্ধি কারও মনে বিষাদের ছায়া ফেলেছে, কারও চোখে এনেছে জল।
পূজা দেখতে আসা নিপা রায় বলেন, নবমীর দিন একদিকে আনন্দ হয়, অন্যদিকে মনে হয় উৎসব শেষ হয়ে আসছে। দশমীতেই দেবীকে বিদায় জানাতে হবে। তাই দিনটিতে আনন্দ ও বেদনা—দুই অনুভূতিই কাজ করে।
আড়াইহাজার থেকে আসা মালিনী ষষ্ঠী থেকেই পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় যুক্ত। মহানবমীতে মন্দিরে আসা ভক্তদের তিলক পরিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। বয়সের ভার ও অসুস্থতা শরীরকে দুর্বল করে দিলেও মন্দিরের কাজে তাঁর বিরাম নেই।
দেবীর বিদায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মালিনী। তিনি বলেন, “এখন আমার ভালো লাগছে না। দুই চোখের জল ফেলতে মন চায়, মায়ের কাছে গিয়ে একটু আলিঙ্গন দিতে চাই। মায়ের সঙ্গে চলে যাই। কিন্তু পারছি না, অসুস্থ হয়ে বসে আছি।”
তাঁর কথায়, দেবীর প্রতি ভক্তির পাশাপাশি উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত আবেগও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক ভক্তের কাছেই দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মিলন, স্মৃতি, প্রার্থনা ও আত্মিক প্রশান্তির উপলক্ষ।
প্রসাদ বিতরণ, উন্নয়নকাজ ও আরতি প্রতিযোগিতা
মহানবমী উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দিনভর ছিল নানা আয়োজন। দুপুর ১টায় ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম মন্দিরের প্রধান ফটকের উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মন্দিরের মূল নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফটকটি আধুনিকভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও মন্দির পরিদর্শন করেন। তাঁদের মধ্যে গণফোরাম, বাসদ ও জাসদের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
নবমীর রাতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আরতি প্রতিযোগিতা। ঢাকের তালে আরতি ও নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে প্রতিযোগীরা নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরেন। এতে ৩০ থেকে ৪০ জন অংশ নেন। তিন সদস্যের বিচারকমণ্ডলী তাঁদের পরিবেশনা মূল্যায়ন করেন। পূজা উদযাপন কমিটি জানিয়েছে, প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের ট্রফি ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। মন্দির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আটশ বছর আগে সেন শাসক বল্লাল সেনের আমলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণে এক ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমাকে ঘিরে আদি পূজার ঐতিহ্য চলে আসছে।
দেশভাগের সময় আদি প্রতিমাটি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে কলকাতার কুমারটুলিতে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দিরে সেটি রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে ১৯৭৮ সাল থেকে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে।
দশমীর প্রস্তুতি, সিঁদুর খেলা ও বিসর্জন
পাঁচ দিনের উৎসবের শেষ দিন বুধবার বিজয়া দশমী। এদিন পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটবে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রক্তদান কর্মসূচিরও আয়োজন থাকবে।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে পূজা ও দর্পণ বিসর্জন সম্পন্ন করার কথা। পরে সকাল ১১টায় দেবীকে বরণ এবং দুপুর ১২টায় সিঁদুর খেলার আয়োজন করা হবে। বিবাহিত নারীরা পরস্পরকে সিঁদুর পরিয়ে উৎসবে অংশ নেবেন।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন রয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য সেখানে যাবেন।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। তাপস কুমার পাল জানান, বিকেল ৪টার দিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা শুরু হবে। শোভাযাত্রাটি পলাশী, জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে ওয়াইজঘাটে পৌঁছাবে। সেখানে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।
দেবীর বিদায় ঘনিয়ে আসায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মহানবমীর উৎসব ছিল আনন্দ ও বিষাদের মিশেল। পূজা, আরতি ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেমন অশুভের বিনাশ ও কল্যাণের কামনা করেছেন, তেমনি বিদায়বেলায় আবারও দেবীর ফিরে আসার অপেক্ষাও শুরু হয়েছে তাঁদের মনে। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হলেও ভক্তদের বিশ্বাস, মা দুর্গা আবারও ফিরে আসবেন নতুন বছরের শরতে—নতুন আশা, নতুন আনন্দ আর মঙ্গলবার্তা নিয়ে।