রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাজেকের পথে উজো বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
পুলিশের ভাষ্য, অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী গাড়িবহর আটকে দেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও গুলি ছোড়েন। পরে জঙ্গলের ভেতর থেকে গুলি চালানো হলে নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা গুলি চালায়। তবে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, গোলাগুলির খবর অস্বীকার করেছে পাহাড়ের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সংগঠনটির দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একতরফা গুলি চালিয়েছেন।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে উজো বাজার এলাকায় পর্যটকবাহী গাড়িবহর আটকে দেন অবরোধকারীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে অবরোধকারীরা তাঁদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়েন। এতে কয়েকজন পর্যটক আহত হন বলে তিনি জানান।
পরে সড়ক থেকে অবরোধকারীদের সরিয়ে পর্যটকদের নিরাপদে উজো বাজার এলাকা পার করে দেওয়া হয়। ওসি তোফাজ্জল হোসেনের ভাষ্য, একপর্যায়ে ইউপিডিএফের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি চালায়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) একজন মুখপাত্রও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি হয়েছে।

বাঘাইছড়ি সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক বলেন, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পর্যটকদের ফিরিয়ে নেওয়ার সময় উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। তাঁদের সরে যেতে বলা হলেও তাঁরা সরে যাননি। একপর্যায়ে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরে জঙ্গলের ভেতর থেকে গুলি চালানো হলে নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা গুলি চালায়।
সহকারী পুলিশ সুপার বলেন, পর্যটকদের কোনো ক্ষতি হয়নি; তাঁদের নিরাপদে এলাকা পার করে দেওয়া হয়েছে। ইউপিডিএফের সদস্যরা সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে আন্দোলন করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে গোলাগুলির খবরকে ‘সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং সাজেকের চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরাই বিভিন্ন দিকে একতরফা গুলি চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিপেটা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তুলেছেন অংগ্য মারমা। তিনি সাজেকের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) একাধিকবার ফোন করা হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
অবরোধে আটকে পড়েন পর্যটকেরা
জেএসএস-সন্তু লারমার সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন। এর অংশ হিসেবে বুধবার বিকেলে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে সংগঠন দুটি। একই সঙ্গে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক সড়কের উজো বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে পিকেটিং শুরু করেন অবরোধকারীরা। একই সময়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় আটকে পড়া পর্যটকদের খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের লাইনম্যান হেপিং ত্রিপুরা জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় সাড়ে চার শতাধিক ছোট-বড় গাড়ি নিয়ে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়েন। গাড়িবহরটি সাজেক ভ্যালি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা তা আটকে দেন। এতে প্রায় সোয়া দুই হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।
তবে উজো বাজারে উপস্থিত বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, সকালে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিয়ে গাড়িবহরটি অবরোধকারীদের ব্যারিকেডের সামনে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বারবার অনুরোধ করলেও অবরোধকারীরা সরে যাননি। একপর্যায়ে পর্যটকবাহী গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে নিরাপত্তা বাহিনী অবরোধকারীদের সরিয়ে পর্যটকদের নিরাপদে নিয়ে যায়। পর্যটকেরা উজো বাজার এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর সশস্ত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবিনিময় হয় বলে তিনি জানান।
পর্যটকেরা জানান, সকাল থেকে তাঁরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। দুপুর পর্যন্ত খাবার পাননি। সেনাবাহিনীর পাহারায় তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের ভাষ্য, পথে চারটি স্থানে আটকে দেওয়া হয়েছিল। উজো বাজারে তাঁদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও গুলি ছোড়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে তাঁদের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান পর্যটকেরা।
অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। গোলাগুলির ঘটনা এবং অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে বিরোধ রয়েছে।