গবেষণায় প্রথমবার নথিভুক্ত পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি; বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও পোনা আহরণ বন্ধে কঠোর নজরদারির সুপারিশ
সুন্দরবনের জলজসম্পদে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রবণতা। বনের বিভিন্ন নদী ও খালে নয় প্রজাতির মাছের মজুদ বাড়তির দিকে থাকলেও ছয় প্রজাতির মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়ার মজুদ কমছে। অবৈধভাবে মাছ আহরণ, ছোট পোনা ধরা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। তবে সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের অবস্থা এখনো সন্তোষজনক বলে মনে করছেন তাঁরা।
‘অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যাকুয়াটিক রিসোর্সেস অব দ্য সুন্দরবন’ শীর্ষক প্রায় দুই বছরের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় প্রথমবারের মতো সুন্দরবনে পাঁচ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পাওয়া গেছে নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি। আগের গবেষণার তথ্যের সঙ্গে নতুন সমীক্ষার ফল মিলিয়ে সুন্দরবনে প্রায় ৩৮২ প্রজাতির মাছের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের গবেষক দল এ সমীক্ষা পরিচালনা করে। বন অধিদপ্তরের ‘প্রটেকশন অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট প্রজেক্ট’-এর অধীনে আরণ্যক ফাউন্ডেশন ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) গবেষণাটি বাস্তবায়ন করে।
গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবনের মাছ ও অন্যান্য জলজসম্পদের বর্তমান অবস্থা, মজুদ, হুমকি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করা। এতে জলজ জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, মাছ ও শামুক-ঝিনুকের মজুদ মূল্যায়ন, ডিএনএ বারকোডিংয়ের মাধ্যমে প্রজাতি শনাক্তকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সুপারিশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
গবেষক দলের প্রধান ড. এম এনামুল হক বলেন, আগে সুন্দরবনে বড় আকারের মাছ, বিশেষ করে ভেটকির প্রাচুর্য বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে ছোট আকারের কিছু প্রজাতির প্রাচুর্য বেড়েছে। গবেষণায় প্রায় ২৬১ প্রজাতির মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। আগের গবেষণার তথ্যসহ সুন্দরবনে প্রায় ৩৮২ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি সম্পর্কে জানা যাচ্ছে।
গবেষণায় অলুয়া বা আমাদি, পারশে, ভেটকি বা কোরাল, পোয়া, দাতিনা, গ্যাগড়া টেংরা, পাঙ্গাস, হরিণা চিংড়ি ও চাকা চিংড়ির মজুদ বাড়তির দিকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পায়রা বা চিত্রা বা বিষতারা, নোনা টেংরা, কাইন মাগুর, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি ও শীলা কাঁকড়ার মজুদ কমতির দিকে রয়েছে। এনামুল হক বলেন, প্রায় ১৫টি মাছ ও চিংড়ির প্রজাতির মজুদ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টির মজুদ কমতির দিকে থাকায় সেগুলোর সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। যেসব প্রজাতির মজুদ কমছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে জালের ফাঁস, আহরণের পরিমাণ এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে।
অতিরিক্ত আহরণ ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা বড় উদ্বেগ
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা। এ পদ্ধতিতে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীও মারা যায়। আবার পোনা বা রেণু সংগ্রহের সময় নির্দিষ্ট প্রজাতি বেছে রেখে অন্য প্রজাতির ছোট মাছ ও জলজ প্রাণী ফেলে দেওয়া হয়। এতে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভবিষ্যতে মাছের মজুদ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণায় ভেটকি, পাঙ্গাস ও গ্যাগড়া টেংরার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আহরণের চাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাতক্ষীরা রেঞ্জে ভেটকি মাছের আহরণ কমাতে কোটা নির্ধারণ, প্রজনন মৌসুমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এবং পোনা সুরক্ষার সুপারিশ করা হয়েছে। খুলনা ও শরণখোলা এলাকায় পাঙ্গাসের মজুদ রক্ষায়ও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শরণখোলা এলাকায় গ্যাগড়া টেংরা আহরণে চাপ থাকায় সেখানে এবং সাতক্ষীরা ও চাঁদপাই রেঞ্জে টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা। কাইন মাগুরের মজুদ কমার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাওয়ায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং শীলা কাঁকড়া, গলদা ও বাগদা চিংড়ির অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
অন্যদিকে আমাদি, পারশে, পোয়া, দাতিনা, হরিণা চিংড়ি ও চাকা চিংড়িসহ কয়েকটি প্রজাতির মজুদ তুলনামূলক নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রজাতির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখতে টেকসই আহরণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির জন্য মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোর উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
চলমান ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ প্রকল্পের টিম লিডার জাকির হোসেন বলেন, সুন্দরবনে গাছ কাটা বন্ধ থাকায় মাছ এখন স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এ সম্পদ সমৃদ্ধ করতে অবৈধভাবে মাছ ধরা, বিষ প্রয়োগ এবং ছোট পোনা আহরণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর অভিযান, নিয়মিত নজরদারি এবং মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
নতুন সাত প্রজাতির সন্ধান
গবেষণায় ডিএনএ বারকোডিংসহ প্রজাতি শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে সুন্দরবনে আগে নথিভুক্ত না হওয়া সাতটি জলজ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এর মধ্যে পাঁচটি মাছ এবং দুটি চিংড়ি। নতুন নথিভুক্ত মাছের মধ্যে রয়েছে একঠুঁটা (Dermogenys burmanica), কুলি বেলে (Butis humeralis), সবুজ বাইল বা ফোঁটা বেলে (Acentrogobius viridipunctatus), ফোঁটা বাট (Crenimugil seheli) এবং বড় আইশ পারশে (Planiliza macrolepis)। নতুন পাওয়া দুই প্রজাতির চিংড়ি হলো মাকড়সা চিংড়ি (Nematopalaemon tenuipes) ও ফোঁটা চিংড়ি (Cloridopsis scorpio)।
গবেষকদের মতে, নতুন প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত হওয়া সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। তবে এসব প্রজাতির বিস্তৃতি, সংখ্যা ও পরিবেশগত ভূমিকা বুঝতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নের আশ্বাস
সুন্দরবনের জলজসম্পদ সংরক্ষণে গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বন অধিদপ্তর। বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকিমূলক কার্যক্রম চলছে। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে একটি চূড়ান্ত কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, গবেষণায় যেসব নতুন সুপারিশ আসবে, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হবে। এ ধরনের প্রতিবেদন সরকারের কাছে পাঠানো হয় এবং পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়।
গবেষণার প্রধান এনামুল হকের মতে, সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের মাছের অবস্থা সন্তোষজনক হলেও মানবসৃষ্ট চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার নির্ভরতা থেকে সৃষ্ট চাপ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা এখন সবচেয়ে জরুরি। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি মাছের শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। মিঠা পানির প্রবাহের পরিবর্তনও মাছের প্রজাতি ও বিস্তৃতিতে প্রভাব ফেলে। সুন্দরবনের মিঠা পানি, আধা-লবণাক্ত ও বেশি লবণাক্ত—এই তিন ধরনের পরিবেশে মাছের উপস্থিতি ও প্রাচুর্য এক রকম নয়। বাগেরহাট অঞ্চলে মিঠা পানির মাছের প্রাচুর্য বাড়ার মতো প্রবণতার পাশাপাশি কিছু এলাকায় লবণসহিষ্ণু প্রজাতির সংখ্যায়ও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের মাছের মজুদ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে শুধু আহরণ নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; বিষ প্রয়োগ বন্ধ, পোনা সুরক্ষা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।