সন্দেহভাজন দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর; ভিডিও ধারণ ও প্রচারের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রের দাবি, অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কেএম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার দাবি করেছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে রিমান্ড শুনানি হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পালিয়ে গিয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার বলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও তাহসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে তাঁদের সন্দেহ। এ ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে। ভিডিওটি ধারণ ও প্রচারের কারণে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে তিনি যুক্তি দেন।
শুনানির পর সাংবাদিকদের কাছেও একই সন্দেহের কথা তুলে ধরেন দিদার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভিডিও ধারণ বা প্রচারের কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
দীপের পক্ষে আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড আবেদন বাতিলের আবেদন জানান। মনিরুল ইসলাম বলেন, তাহসিফের সঙ্গে দীপের ছয় বছরের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। তাহসিফের বাবা শুরুতে দীপের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, দীপ শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করে আসছেন এবং তাঁকে নিয়ে গণমাধ্যমে আগাম বিচার চলছে। ঘটনাটি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা—তা নিয়েও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মুতাসিম বিল্লাহর বক্তব্য, দীপ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁরাও সহযোগিতা চান।
রিমান্ডের আদেশের পর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় দীপ এক স্বজনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি ফুললি স্ট্রং।’ তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার কথাও বলেন তিনি।
যেভাবে সামনে আসে দীপের নাম
তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ গত বুধবার বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। সঙ্গে ছিল তাঁর মোটরসাইকেল।
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার পর দীপ জানিয়েছিলেন, তাঁরা একসঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়েছিলেন। পরে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাঁরা আলাদা হয়ে যান। তবে পরবর্তী সময়ে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই)। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা করার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর আগে তাহসিফের পরিবার মামলা করতে আগ্রহী ছিল না বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে উল্লেখ করেন।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ, তাঁর সঙ্গে শেষ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের অপেক্ষায়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সন্দেহ ও আসামিপক্ষের বক্তব্যের কোনোটিই নিজে থেকে অপরাধ প্রমাণ করে না। তদন্তের ফল এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই ঘটনার প্রকৃত রহস্য নির্ধারিত হবে।