পাসের হার ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ; কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতি, শিক্ষকসংকট, পাঠদানের দুর্বলতা ও মূল্যায়নপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার অর্ধেকের কাছাকাছি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
এই ফলাফল কি শুধু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগের প্রতিফলন, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতি, শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দুর্বলতা এবং পরীক্ষার মূল্যায়নপদ্ধতির সমস্যা? শিক্ষাবিদদের বক্তব্যে উঠে এসেছে একাধিক কারণ। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় শুধু পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। একই সঙ্গে মূল্যায়ন কঠোর হওয়া আর পাঠদানের মান উন্নত হওয়া যে এক বিষয় নয়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ফলাফলে ধস, প্রশ্নের মুখে শিক্ষাব্যবস্থা
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে, পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে ফলাফলের এই বড় পতন শিক্ষার মান, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শুধু ব্যক্তিগত ফলাফলে নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সাফল্যেও অবনতি দেখা যাচ্ছে। এবার ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২। অন্যদিকে, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪৫ থেকে কমে হয়েছে ১৩৯।
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে সেটিকে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না। সেখানে শিক্ষকসংকট, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি—সবকিছু পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এসব কারণের কোনটি কতটা দায়ী, তা নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।
কোভিডের শিখনঘাটতি ও আন্দোলনের প্রভাব
ঢাকা রেসিডেনশিয়াল কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আরিফুর রহমানের মতে, এবারের পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের শিক্ষাজীবন কোভিড মহামারিতে ব্যাহত হয়েছে। পরে কলেজজীবনে জুলাই আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত সিলেবাস শেষ করার চাপও ছিল। তাঁর বিশ্লেষণে, আন্দোলন ও অস্থিরতার সময় নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া এবং পরীক্ষার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কারণের প্রভাব কতটা, তা জানতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদানের সময়, সিলেবাস সম্পন্ন হওয়ার হার এবং বিষয়ভিত্তিক ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিবও কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতি এবং কলেজজীবনে আন্দোলনজনিত বিঘ্নের বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, দুই বছরের উচ্চমাধ্যমিক সিলেবাস নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করাও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই দুই শিক্ষাবিদের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে যে প্রস্তুতি নিয়ে বসেছেন, তা শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ের ওপর নির্ভর করেনি। মাধ্যমিক পর্যায়ে শেখার ভিত্তি কতটা শক্ত হয়েছে, কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না এবং নির্ধারিত পাঠ্যসূচি যথাযথভাবে শেষ করা গেছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোভিড বা জুলাই আন্দোলনকে এককভাবে ফল বিপর্যয়ের কারণ বলা যাবে না। এগুলোর প্রভাব বুঝতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী ফলাফল, উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক নম্বর এবং পাঠদানের তথ্যের সঙ্গে এবারের ফল মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষকসংকট, দুর্বল পাঠদান ও ব্যক্তিগত প্রস্তুতি
ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। রাজধানীর একটি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আব্দুস সাত্তার জানান, তাঁর লক্ষ্য ছিল জিপিএ-৫ পাওয়া। কিন্তু পেয়েছেন ৪.৫০। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পেয়েছেন বলে জানান তিনি। সাত্তারের অভিযোগ, তাঁর কলেজে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় পাঠদান হয়নি। বাসায় নিজে পড়াশোনা ও প্রাইভেট পড়ার মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ধারণা, কলেজে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে ফল আরও ভালো হতে পারত।
একজন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা দিয়ে সারা দেশের ফলাফলের কারণ নির্ধারণ করা যায় না। তবে তাঁর বক্তব্য শিক্ষকসংকট ও শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মতো বিষয়ে নিয়মিত অনুশীলন, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও শিক্ষকসংকটের কথা স্বীকার করেছেন। ফল প্রকাশের পর তিনি বলেন, অতীতের শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বাধা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ বছরের নিয়োগসংক্রান্ত ঘাটতি রয়েছে এবং একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন, কোথায় শূন্য পদ বেশি, কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না এবং শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে পিছিয়ে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠপরিকল্পনা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে সমস্যা, মূল্যায়ন নিয়েও বিতর্ক
ঢাকা রেসিডেনশিয়াল কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এবারের পদার্থবিজ্ঞানের দুটি প্রশ্নে সমস্যা ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। তবে তিনি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিকেও ফল খারাপ হওয়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রশ্নপত্রের ত্রুটিকে সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ বলা যায় না। বরং প্রশ্নের মান, পাঠ্যসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য, প্রশ্নের ভাষা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর দেওয়ার সুযোগ এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়ন—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্নপত্রে ত্রুটি থাকলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। আবার পাঠ্যসূচি অনুযায়ী প্রস্তুতি না থাকলে প্রশ্ন যথাযথ হলেও শিক্ষার্থীরা ভালো করতে পারবেন না। তাই শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়ারও স্বচ্ছ পর্যালোচনা দরকার।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এসএসসি পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয় এবং ৫ হাজার শিক্ষার্থী অকৃতকার্য থেকে কৃতকার্য হন। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছিল ৩ হাজার ৭৯ জন।
এই তথ্য মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে। তবে পুনর্নিরীক্ষায় গ্রেড পরিবর্তন হলেই মূল মূল্যায়নপ্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কতটি খাতায় যোগফলের ভুল, কতটিতে নম্বর গণনায় ত্রুটি এবং কতটিতে মূল্যায়নসংক্রান্ত পরিবর্তন হয়েছে, তা আলাদা করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ, খাতা মূল্যায়নব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা এবং অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এ উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে মূল্যায়নের অভিন্ন মানদণ্ড, পরীক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য: দায় নিতে হবে সবাইকে
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলাফলের এই পতনকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন, পাঠদানপদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা এবং শিক্ষার পরিবেশে ঘাটতি রয়েছে। শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করলে চলবে না; শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
এই বক্তব্যের সঙ্গে শিক্ষাবিদদের বিশ্লেষণের একটি মিল রয়েছে। ফলাফল উন্নত করতে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের মান, শিক্ষকসংকট, পাঠ্যসূচি বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নব্যবস্থার দুর্বলতাও সমাধান করতে হবে।
অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে পড়াশোনার দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। সব পরিবারের পক্ষে ব্যক্তিগত শিক্ষক বা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা আরও বেশি অসুবিধায় পড়তে পারেন।
উত্তরণের পথ: ফল নয়, শিখনকে গুরুত্ব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিবের মতে, শিক্ষার মান নিশ্চিত না করে মূল্যায়নপদ্ধতি কঠোর করলে ভালো ফল আশা করা যায় না। তাঁর বক্তব্য, পরীক্ষার খাতার ফলাফলের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আগে পাঠদানের মান নিশ্চিত করে পরে মূল্যায়নের মানদণ্ড কঠোর করা উচিত।
এই বক্তব্যের আলোকে ফলাফল বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, শিখনঘাটতি শনাক্ত করে বিষয়ভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। কোন শিক্ষার্থী কোন অধ্যায় বা দক্ষতায় পিছিয়ে, তা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। শুধু পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত ক্লাস নয়, সারা বছর দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পাঠদানের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকসংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান করতে হবে। বিষয়ভিত্তিক শূন্য পদের তালিকা প্রকাশ, প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগ ও পদায়ন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ধরে রাখার ব্যবস্থা জরুরি। নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, পাঠ্যসূচি ও পরীক্ষার মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা দরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যসূচি শেষ করা সম্ভব হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছেন কি না এবং প্রশ্নপত্র পাঠ্যসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
চতুর্থত, মূল্যায়নব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বাড়াতে হবে। পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নম্বর দেওয়ার অভিন্ন নির্দেশনা, খাতা মূল্যায়নের মান যাচাই এবং পুনর্নিরীক্ষায় পরিবর্তনের কারণ প্রকাশ করলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্রে ত্রুটি থাকলে তা শনাক্ত করে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে।
পঞ্চমত, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃথক তদন্ত ও সহায়তা প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, ব্যবস্থাপনা এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে। সমস্যার ধরন বুঝে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।
ষষ্ঠত, কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। শিক্ষার্থীদের বর্তমান দক্ষতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহায়ক পাঠদান, পুনরাবৃত্তি এবং অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হলে বিকল্প একাডেমিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
সবশেষে, ফলাফল বিশ্লেষণের তথ্য প্রকাশ করতে হবে আরও বিস্তারিতভাবে। বোর্ড, জেলা, প্রতিষ্ঠান, বিষয়, শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী ফলাফল এবং শিক্ষকসংকটের সঙ্গে পাসের হারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে কোন জায়গায় কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ সহজ হবে। শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান বিচার করা যায় না।
কঠোর মূল্যায়ন, নাকি শিক্ষার ঘাটতির প্রকাশ
এবারের ফলাফলকে একদিকে মূল্যায়নব্যবস্থার কঠোরতার ফল এবং অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতির প্রতিফলন হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। বাস্তবে দুটি বিষয়ই ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ দরকার। শিক্ষার্থীরা কেন ফেল করেছেন, কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা রয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হয়নি এবং পুনর্নিরীক্ষায় কী ধরনের ভুল ধরা পড়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু পরীক্ষা কঠিন করা বা সহজ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না।
এবারের ফলাফল তাই শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করারও সুযোগ। শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করা, শিক্ষকসংকট দূর করা, শ্রেণিকক্ষের মান উন্নত করা এবং মূল্যায়নে নির্ভুলতা প্রতিষ্ঠা—এই চারটি জায়গায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে ফলাফলের উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষার প্রকৃত মানও বাড়ানো সম্ভব হবে।