দীপের তথ্যেই উদ্ধার মোটরসাইকেল, মৃত্যুর রাতের বর্ণনায় অসংগতি
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ‘জুনিয়র বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন দীপ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। তবে মৃত্যুর তিন দিন পরও কোনো মামলা হয়নি; ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্রও এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। শুক্রবার তাঁকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তথ্য যাচাইয়ের পর নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মধ্যরাতে পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম মামলা করতে অনীহার কথা জানিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, সরকার নিজ উদ্যোগে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করবে। তিনি বলেন, ‘মামলার বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব। মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ বিষয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এরকম ঝামেলার মধ্যে পড়তে?’
পরিবার মামলা না করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে পুলিশ ইউনিটগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেছিলেন, নৌ পুলিশ চাইলে অপমৃত্যুর মামলা করতে পারে। নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিনের বক্তব্য, মরদেহ উদ্ধার করা হলেও ঘটনাস্থল উত্তরখান থানার আওতাধীন হওয়ায় বিষয়টি ওই থানা পুলিশ দেখবে। উত্তরখান থানার ওসি হাবিবুর রহমান জানান, এখনো মামলা হয়নি; ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৃত্যুর রাতের বর্ণনায় অসংগতি
দীপের দেওয়া তথ্য ও সংবাদমাধ্যমে তাঁর আগের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছিলেন, তাহসিফের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় আলাদা হয়ে যান। পরে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ জানিয়েছেন, ওই এলাকায় অবস্থানের সময় পুলিশের একটি দল তাঁদের ধাওয়া করে। তখন তিনি তুরাগ তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। পরে সেখান থেকে চলে গিয়ে রাত আড়াইটার দিকে বাসায় ফেরেন বলে দীপের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
তবে পুলিশের ধাওয়া, তাহসিফের নদে ঝাঁপ দেওয়ার পরিস্থিতি এবং তাঁদের সেখানে যাওয়ার কারণ এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। ওই সময় সেখানে অন্য কেউ ছিলেন কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাইকটি উদ্ধার হয়েছে। এর বাইরে কীভাবে কী হয়েছে, তারা কোথায় বা কেন গিয়েছে, আরও কে কোথায় আছে, সবগুলো বিষয় যাচাই পর্যায়ে আছে। সব তথ্য ভেরিফায়েড করে পরে জানাব।’
মরদেহ উদ্ধার বুধবার, মোটরসাইকেল শুক্রবার
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। তাঁর দেওয়া তথ্যেই পরদিন মোটরসাইকেলটির সন্ধান মেলে।
মোটরসাইকেল উদ্ধার ও দীপের বর্ণনা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও এগুলো দিয়ে মৃত্যুর কারণ বা কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পিবিআই বলছে, সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই চলছে। অন্যদিকে পরিবার মামলা না করায় আনুষ্ঠানিক আইনি পদক্ষেপ কীভাবে এগোবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।